করোনাকালে অনন্য বাংলাদেশ

  • 115
    Shares

হাজারো স্বেচ্ছাসেবী মানুষের দু:সাহসী এবং মানবিকতার গল্প শুনে অবচেতনে চোখ ভিজে যায়,মনের মধ্যে অদ্ভুত এক আনন্দ ঢেউ খেলে বেড়ায় ; হাজারো অভাব, অভিযোগ ও হতাশার মাঝেও এই গল্পগুলোই নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়,নিজেকে মানুষ ভাবতে গর্ব বোধ হয় এবং আরও বহুদিন বাঁচতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আফসোস ! গুটিকয়েক চাল চুরির ঘটনার বানিজ্যিক প্রচারের কারনে এসব হাজারো মন ভালো করা খবর কখনই আলোর মুখ দেখে না!

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমনের পর থেকে জনপ্রতিনিধি কর্তৃক ত্রাণ চুরির ঘটনা করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছে।কিন্তু বাংলাদেশে চেয়ারম্যান ,মেম্বার কর্তৃক চাল চুরি মোটেও নতুন কোন ঘটনা নয়।জন্মের পর থেকেই “গম চোর চেয়ারম্যান” কথাটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত।কিন্তু করোনায় মুদ্রার উল্টো পিঠে নতুন এক বাংলাদেশের দেখা মিলেছে যা সারাবিশ্বের জন্যই অনুপ্রেরণার।গুটিকয়েক জনপ্রতিনিধি চাল চুরি করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও অনেক চেয়ারম্যান,মেম্বার, ছাত্র, শিক্ষক,রাজনীতিবিদ,ব্যবসায়ী,ডাক্তার, পুলিশ,সেনাবাহিনী,ব্যাংকার, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ ছোট-বড় হাজারো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যেভাবে অসহায় মানুষের পাশে খাবার,ঔষধ, সুরক্ষা সামগ্রী এবং নগদ অর্থ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে তা সত্যিই নজিরবিহীন।

জনপ্রতিনিধিদের ত্রাণসামগ্রী চুরির গল্পে যখন পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সয়লাব তখন বাগেরহাটের তরুণ সাংসদ শেখ সারহান নাসের তন্ময় চালু করেন ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল।নড়াইলের এমপি ‘ক্যাপ্টেন’ মাশরাফি বিন মুর্তজা ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে হয়রান হওয়া মানুষদের জন্য সেফটি চেম্বার স্থাপন করেন।রাজশাহীর বাঘার ৩নং পাকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তরুণ চেয়ারম্যান মেরাজ সরকারের গা থেকে এখনও ছাত্রের গন্ধই যায়নি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করে যৌবনে পা দেওয়া এই ছোট ছেলেটিই করোনা সংকটে মানুষের বাড়ি বাড়ি ত্রাণ পৌছানোর পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে হাট বসানো,হাটের লোকজনের হাত ধোয়ার অভিনব ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা তৈরি করে গড়েছেন অনন্য নজির;এমনকি জনগনের সেবা করতে গিয়ে নিজেই করোনা আক্রান্ত হলেও এক মুহূর্তের জন্যও দমে যাননি।

করোনার উপসর্গ নিয়ে বা করোনা আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে পরিবারের লোকজন যখন সৎকার করতে ভয়ে এগিয়ে আসেনি, সেই সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ করেনায় আক্রান্ত বা করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া অসংখ্য মৃতদেহ সৎকার করে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ উপাধি পেয়েছেন; তিনি এবং তাঁর স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়েও ঘোষণা দিলেন- যত বাধাই আসুক না কেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত করোনা নিয়ে যুদ্ধ করে যাবো ইনশাআল্লাহ।

এছাড়া দরিদ্র মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য ভর্তুকি দিয়ে ৩০ টাকা হালির ডিম ১২ টাকা হালি বিক্রি করছেন কাউন্সিলর খোরশেদ।এরকম শতশত তরুন জনপ্রতিনিধি,রাজনীতিবিদ নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে করোনায় অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়েছে;সরকারী ত্রাণ সুষ্ঠুভাবে বিতরণের পাশাপাশি নিজস্ব তহবিল থেকেও সাধ্যমত সহায়তা করছেন।এমনকি অভ্যন্তরীন কোন্দল, টেন্ডার, চাঁদাবাজি,মারপিটসহ নানান অভিযোগে সমালোচিত ও মারাত্বক ভাবমূর্তি সংকটে পরা ছাত্রলীগও নতুন এক আগমনী গান শুনিয়েছে।কিন্তু এসব ভালো খবরের চেয়ে চাল চুরির ঘটনা প্রচার হয় বেশি কারন বেশিরভাগ শ্রোতা নেগেটিভ খবর শুনতেই ব্যাপক আগ্রহী থাকে।কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি গরীবের চাল চোরদের নয়, আগামীর বাংলাদেশ হবে শেখ তন্ময়,ক্যাপ্টেন মাশরাফী,মেরাজ চেয়ারম্যান এবং খোরশেদ কাউন্সিলরদের বাংলাদেশ।

ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ ভোলার দুর্গম চর, কুড়িগ্রামের অজ পাড়াগাঁ, সিলেটের চা শ্রমিকদের ঘরে, এমনকি পাহাড়ের গহিনে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার বিপন্ন পরিবার,বৃদ্ধাশ্রম,এতিমখানা এবং মাদ্রাসায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছে দিচ্ছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।খাবার বিতরণ ছাড়াও গ্রামের বঞ্চিত কৃষকদের কাছ থেকে সবজি ও ফলমূল কিনে শহরের অসহায় মানুষদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ, করোনা মহামারিতে কর্মহীন মানুষকে স্বাবলম্বী করাসহ নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বিদ্যানন্দ।বিদ্যানন্দকে বিতরণের কাজে সহযোগিতা করছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি ও কোস্টগার্ড।আর বিদ্যানন্দকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছে সারা বাংলাদেশের নাম না জানা লাখ লাখ সাধারণ জনগন।করোনাকালীন দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের পাশে এমন আলোর দিশারি হয়ে উঠেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

বিদ্যানন্দের মতো এতো বড় পরিসরে না হলেও সারাদেশে সকল বিভাগ,জেলা, উপজেলা,গ্রাম,পাড়া,মহল্লা,অলি,গলি, এমনকি প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাতেও ছোট,বড় হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অসহায় মানুষের খাদ্য সরবরাহের জন্য দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে।যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে ইশরাত করিম ২০১৫ সালে আমাল ফাউন্ডেশন নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন।১৮ জন স্থায়ী কর্মী এবং সারা দেশে প্রায় ৪০০ স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে ইশরাতের আমাল ফাউন্ডেশন করোনাকালে ৬ হাজার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে ।ইশরাত করিমের মতো এরকম শতশত তরুণ-তরুণী করোনাকালে বাংলাদেশের আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।

শুধু যে অসহায় মানুষদেরকেই খাবার দেওয়া হচ্ছে তা নয়,আমাদের তরুন যোদ্ধারা অভুক্ত পশুদের পাশেও দাঁড়িয়েছে।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুন শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠিত “ক্যাম্পাস পোষা প্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্প”এর মাধ্যমে করোনার দুঃসময়ে ক্যাম্পাসের অভুক্ত কুকুর-বিড়ালদের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর সদস্যরা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজেরাও ত্রাণের ব্যাগ কাধে নিয়ে রাতের অন্ধকারে অসহায় মানুষের ঘরে ঘরে পৌছে দিচ্ছে।প্রশাসনের কর্তারা ত্রাণ চুরি ঠেকাতে অক্লান্ত পরিশ্রমের সাথে সাথে নিজেরাও বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত।তবে করোনা যুদ্ধের ইতিহাসে সম্মুখ সমরের বীর সেনানী হিসেবে সবার উপরে লেখা থাকবে আমাদের পুলিশ বাহিনীর নাম।

দীর্ঘদিনের দুর্নাম ঘোচানো এবং হাড়ানো গৌরব ফেরানোর লড়াইয়ে বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে আইজি পর্যন্ত প্রতিটা সদস্য যেনো জীবন বাজি রেখে লড়াই করে যাচ্ছে।পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব সত্বেও নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, লকডাউন,কোয়ারেন্টাইন,আইসোলেশন নিশ্চিৎ করা,অসুস্থ্য রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া,করোনায় মৃত ব্যক্তির জানাজা, লাশ দাফন করার পাশাপাশি ঘরবন্দী কর্মহীন অসহায় মানুষের জন্য নিজের পকেটের টাকা দিয়েও যেভাবে খাদ্যসামগ্রী পৌছে দিয়েছে , তাতে সাধারণ জনগন পুলিশকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

ডাক্তার,স্বাস্থ্যকর্মী,ব্যাংকার,সংবাদকর্মী, কাস্টমস,বিদ্যুৎ,ওয়াসা,ফায়ার সার্ভিস সহ অন্যান্য জরুরীসেবার কর্মীরা সম্মুখে থেকে শুধু সেবাই দিচ্ছেনা, নিজের সাধ্যমতো দরিদ্র মানুষদের সহায়তাও করছে।এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণীপেশার লাখো মানুষ ব্যক্তিগতভাবে কোন প্রচারনা ছাড়াই যার যার সামর্থ অনুযায়ী চেষ্টা করছে গরীব আত্বীয় স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব,সহকর্মীসহ পরিচিত, অপরিচিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবার।

করোনভাইরাস পৃথিবীর বুকে ভয়াবহ এক ছাপ রেখে যাবে।তৈরি হবে মানুষের অমানবিক হয়ে ওঠার হাজারো গল্প। আবার মানুষের মধ্যেই কেউ কেউ মহামানব হয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে বাঁচাবে অন্য মানুষের জীবন।
ময়মনসিংহ শহরের একদল স্বেচ্ছাসেবী তরুণ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দিকে সেবার হাত বাড়িয়ে দেন।স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে একজন তরুণ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও দৃঢ়তার সাথে জানান ”যদি বেঁচে ফিরি, দেখা হবে।আবার নামব রাস্তায়, কথা দিলাম।”

উজ্জল হোসেন : শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


  • 115
    Shares
শর্টলিংকঃ