চঞ্চল চৌধুরীর ‘হিন্দু মা’ ও সাম্প্রদায়িক মন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শক্তিমান অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর মা দিবসের ছবি দেয়াকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তার কারণ তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের, সেটা অনেকেই হয়তো জানতেন না, মায়ের সিঁথিতে সিঁদুর দেখে হয়তো আঁতকে উঠেছেন, এতো ভালো অভিনেতা কী করে হিন্দু হলেন! কতোটা কূপমণ্ডুকতা আর জাত্যাভিমান থাকলে সেটা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত চঞ্চল চৌধুরী এসব কুরুচিপূর্ণ আক্রমণের জবাবে বাধ্য হয়ে পিন কমেন্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘ভ্রাতা ও ভগ্নিগণ, আমি হিন্দু নাকি মুসলমান তাতে আপনাদের লাভ বা ক্ষতি কি? সকলেরই সবচেয়ে বড় পরিচয় মানুষ।

ধর্ম নিয়ে এসকল রুচিহীন প্রশ্ন ও বিব্রতকর আলোচনা সকল ক্ষেত্রে বন্ধ হোক। আসুন সবাই মানুষ হই’। আসলেই কি মানুষ হওয়া সহজ ব্যাপার। বাউল শাহ আবদুল করিমের সেই গানটির কথা মনে পড়ে গেল, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। সত্যিই কি আগে সুন্দর দিন কাটাতাম। এক কথায় এর উত্তর দেয়া বেশ কঠিন। কারণ পক্ষে বিপক্ষে নানা যুক্তি এসে হাজির হবে। তবে একথা কে না জানে, মানুষের জন্মের জন্যতো আর তিনি দায়ী নন। তাইতো বলা হয়, জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো। আমাদের শৈশবটা সে অর্থে হিন্দু মুসলমান আমরা আলাদা করতে পারিনি।

শুধু স্কুলের বন্ধুদের কাছে শোনা ‘বেহেশত তাদের জন্য নির্দিষ্ট’ এই কথাটি ছাড়া। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আশেপাশের মানুষগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিল হিন্দু মুসলমান আলাদা। দুর্গাপুজোয় আমার বাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু-বান্ধবীরা হরহামেশাই যেতো। কিন্তু তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় এক একেক জনের পিলে চমকে যেত, ‘জয়নাল, মহিউদ্দিন শাহীন বা সাদিয়ারা কেন দুর্গাপুজোয় আনন্দ করতে এলো’! কোনো একটি আয়োজনে হয়তো ব্যঞ্জন হিসেবে গরুর মাংস রাখা হয়েছে। না খেলেই নানা উদাহরণ হাজির করা হতো, এখনো। তার পরিচিত কোন দাদা এক বসায় এক বাটি গরুর মাংস খান! কিন্তু একটা বিষয় বোঝানো বেশ মুশকিল যে, খাওয়ার সাথে ধর্মের কোনো পার্থক্য খুঁজি না।

এটা অভ্যস্ততা ও রুচির বিষয়। শুকর, গুই সাপের মাংস, তেলাপোকা বা অক্টোপাসের স্যুপ খেয়ে যেমন অভ্যস্ত নই। তেমনি গরুর মাংসও একই। আবার অনেক বন্ধুই দাওয়াত দিয়ে না জানিয়ে কোনো হিন্দু বন্ধুকে গরুর মাংস খাইয়ে দিয়ে বুনো উল্লাস করতেও দেখেছি। কে না জানে, রেডমিট শরীরের জন্য কতোটা খারাপ। এছাড়া সহপাঠী, সহকর্মী থেকে শুরু করে কতোজনের কাছ থেকে এখনো ‘মালু’ বা ‘মালাউন’ শব্দটা শুনতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আমরা জানি, গরুকে কৃষ্ণের বাহন মনে করে হিন্দুদের মধ্যে সন্মানবোধ থাকতেই পারে। অন্যের সন্মানবোধকে আঘাত না করাও সভ্য মানুষের দায়িত্ব। কিন্তু কোরবানির সময় দেখা যায়, অন্যের অসুবিধার কথাটা থোড়াই কেয়ার করা হচ্ছে। বিভিন্ন পুজোয় দেখি আজানের সময় হলে মাইক বন্ধ করে দেয়া হয়। এটি খারাপ কিছু নয়। সম্প্রতি বজায় রাখতে এটি করাই যেতে পারে। কিন্তু পুজোর সময়ও ততোটা সন্মান প্রদর্শন এদেশের নাগরিক হিসেবেতো আশা করাই যেতে পারে। আরেকটি বিষয় বেশ অবাক করার মতো, ভারতে কোনো আত্মীয় থাকাটা যেন অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

পাকিস্তানি আমলে গেঁথে থাকা দ্বিজাতি তত্ত্বের ভূত এখনকার প্রজন্মের মধ্যেও ঢুকে গেছে। অথচ দেশভাগের সময়, পাকিস্তানি আমলে বা স্বাধীন দেশেও ভিটেমাটি হারিয়ে এদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ভারতে বিশেষ করে কলকাতায় পাড়ি জমিয়েছেন। তো তাদের আত্মীয় এদেশে থাকাটাতো বিচিত্র কিছু নয়। অথচ আমরা বলে থাকি, এদেশ তোমার আমার। স্লোগান দেই, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। ধর্ম তো যার যার ঠিক আছে, কিন্তু রাষ্ট্র কি সবার সমান সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে? বা করার চেষ্টা করছে? অনেকেই যুক্তি দেন, ভারতেওতো একই অবস্থা।

সেখানেও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করা হয়। জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলাচ্ছে, পেটাচ্ছে, খুন করছে। আসলে শুধু ভারত নয়, পুরো পৃথিবীতে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি যতোটা এগিয়ে নিতে চেষ্টা চলছে ততোই সেটা কৌশল পাল্টে করোনার মতো সাধারণ নীরিহ জনগণের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠছে। কিন্তু আমরা কেন আলাদা হবো না। নয়মাসের যুদ্ধে কতো কতো প্রাণ বলিদান দিয়ে তবেই না পেয়েছি সুজলা সুফলা এই রাষ্ট্র। পাকিস্তান আমলে এই দেশটা ছিল ইসলামিক রিপাবলিক। সেখানে ‘হিন্দুরা’ ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ যাত্রা করেছিল সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু সংবিধানে কাঁচি চালিয়ে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন করা হয়েছে। আর যেহেতু ধর্মের সাথে অনুভূতি জড়িয়ে আছে কাজেই সেখান থেকে পরে আর কোনো শাসকই বেরোনোর চেষ্টা করেনি। কারণ ভোটের হিসাব নিকেষ বেশ জটিল। এখনও ইসলামের হেফাজতকারীদের কাছে মাথা নত করে রাখে সরকার।

হিন্দু মুসলমানের এই বিরোধ কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। লেখক-রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘প্রকৃত অবস্থাটা এই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তানও ভাঙে নাই। “দ্বিজাতি তত্ত্ব”ও মিথ্যা হয় নাই। এক পাকিস্তানের জায়গায় লাহোর প্রস্তাবমতো দুই পাকিস্তান হইয়াছে। ভারত সরকার লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নে আমাদের সাহায্য করিয়াছে। তারা আমাদের কৃতজ্ঞতার পাত্র।…পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্র-নাম রাখিয়াছে “পাকিস্তান”। আমরা পুরবীরা রাখিয়াছি বাংলাদেশ। এতে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নাই।’ (সূত্র: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর)। আগে এতোটা সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়াতো না। হলেও সেটা সীমাবদ্ধ থাকতো নিজ এলাকায়।

কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবাধ প্রবেশাধিকার মানুষে মানুষে ভেদাভেদের দেয়াল তুলে দিচ্ছে। একটা সময় ছিল, বাংলাদেশের অনেক জায়গায় হিন্দু মুসলমান একসাথে বসতো না। কোনো পিঁড়ি বা জাজিমে বসলে সেটা ধুয়ে ফেলা হতো। হুকার জল ফেলে দেয়া হতো। মুসলমানদের স্পর্শে এলে গোসল করতে হতো। এখন সেগুলো নেই বললেই চলে। বন্ধুর মতো মিলেমিশে থাকলেও মনের ঘরে সাম্প্রদায়িকতাটা রয়েই গেছে। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই এক দেশে দু’রকম নাগরিকত্ব সন্মান দেয় অনেক সময়। কোনো রসরাজ, উত্তম বা টিটু ফেক নিউজের শিকার হলে শত শত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়।

আর হামলাকারীদের বিচার যেমন বছরের পর বছরেও শেষ হয় না, তেমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্যে যেসব হুজুররা বিষ বুনে দিচ্ছেন তাদেরও বিচার হয় না।
প্রকৃতপক্ষে সুশিক্ষার অভাবেই এসব হচ্ছে। একের পর এক আঘাত আসছে উৎসবসহ বাঙালির সংস্কৃতির ওপর। সয়ে যাচ্ছে সবকিছু। কোনো প্রতিবাদ নেই। প্রতিরোধ নেই। লেখাপড়া অনেক করলেও শিক্ষিত হওয়া যে হয়ে উঠে না সেই বিষয়টি নেই।

রাষ্ট্র মাঝে মাঝে হয়ে পড়ছে শৃঙ্খলাহীন। কারণ এসব বিকৃতমনা মানুষকে বশে আনতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সুশিক্ষা বা গবেষণাধর্মী শিক্ষাও জরুরি। নইলে তারা ছেলেবেলা থেকেই অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে কাফের বলেই জানবে। যাদের সাথে তাদের বেহেশত ভাগাভাগি হবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
শর্টলিংকঃ