গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই, লগি-বৈঠার আন্দোলন এবং আমার দায়

  • 153
    Shares

২৮ অক্টোবর ২০০৬। বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনবদ্য দিন। তৎকালীন বিএনপি-জামাত-চার দলীয় জোটের অপশাসন, গণতন্ত্র ছিনতাইয়ের হাত থেকে দেশ ও জনগণকে মুক্ত করার এক অবিনশ্বর লড়াইয়ের দিন।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র ক্যান্টনমেন্টের অস্ত্রের জোরে উর্দিধারীদের জোর করে দখল করা ক্ষমতার বদৌলতে বদলাতে থাকে। পাকিস্তানমুখী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে আবারো প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জামাত এবং তাদের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রধান মিত্র বিএনপি গাঁটছড়া বেঁধে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।

বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের দিক থেকে জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের গুলি ছোড়ার দৃশ্য
বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের দিক থেকে জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের গুলি ছোড়ার দৃশ্য

পঁচাত্তরের পরে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা চলে, ২০০১ এ ক্ষমতায় এসে এই অপশক্তির জোট রাষ্ট্রক্ষমতার জোরে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে উগ্র ধর্মীয় সশস্ত্র জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটায়। বাংলা ভাই-জেএমবি গোষ্ঠীর তাণ্ডব, একের পর এক সভা-সমাবেশ-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-সিনেমা হল-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বোমা-গ্রেনেড হামলা, সারাদেশের ৬৩ জেলার পাঁচ শতাধিক স্থানে একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মতো ভয়ংকর জঙ্গিবাদী তৎপরতা চলতে থাকে। এসব সবারই জানা।

তার সাথে সাথে বিএনপি-জামাত শাসনামলে ‘হাওয়া ভবন’ এর মতো ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র স্থাপন করে দুর্নীতি-দুঃশাসন-দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়। খালেদাপুত্র তারেক রহমানের মতো একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ এবং গ্রেনেড হামলা ও হত্যাকাণ্ডের হোতাকে দেশের তরুণ সমাজের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা করা হয়।

বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের দিক থেকে জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের গুলি ছোড়ার দৃশ্য
বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের দিক থেকে জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের গুলি ছোড়ার দৃশ্য

একদিকে উগ্র ধর্মীয় সশস্ত্র জঙ্গিবাদ, অপরদিকে দুর্নীতি-দুঃশাসনের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলো বাংলাদেশের মানুষ। বিপরীতে ক্ষমতাসীনরা এই অপশাসনকে চিরস্থায়ী করার দুঃস্বপ্নে মত্ত হয়ে ওঠে। তারা মানুষের সাধারণ ভোটাধিকার হরণ করে নানা কৌশলে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রূপ দেওয়ার নকশা আঁকে। এ লক্ষ্যে সে সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে নিজেদের দখলে নিতে চেয়েছিলো। সে সময়ের কেএম হাসান-এমএ আজিজ কাহিনী নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। তার সাথে এক কোটি ভূয়া ভোটার এবং তিনশ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা পদে ছাত্রদল-শিবিরের চিহ্নিত ক্যাডারদের নিয়োগ দিয়ে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে করায়ত্ব করার সব ছক আঁকা ছিলো।

এর বিপরীতে মানুষ তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিলো রাজপথে, রাজধানী থেকে প্রান্তিক জনপদে ১৪ দলের নেতৃত্বে। আন্দোলন সংগ্রামের মুখে এক সময় শেষ হয়ে আসে বিএনপি-জামাতের শাসনকাল। ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর তাদের মেয়াদান্তের দিন ছিলো। কিন্তু সমাধান হলো না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট বিতর্ক। ২৭ অক্টোবর দুপুরের পর থেকেই দিকে দিকে বিএনপি-জামাতের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠতে থাকে।

জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীনদের দলীয় কার্যালয়ে হামলা করে, আগুন জ্বালিয়ে দেয় জনগণের ক্ষোভ এতোটাই পুঞ্জিভূত ছিলো। ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিলো। কিন্তু বিএনপি-জামাতের কৌশলে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে তাদের অনুগত কেএম হাসানকে বসানোর প্রক্রিয়া কোনোভাবেই জনগণ মেনে নেয় নি। উল্টোদিকে বিএনপি-জামাতও জনদাবি অনুধাবন করে সত্যের কাছে মাথানত করতে রাজি ছিলো না। ফলে সংঘাত অনিবার্য ছিলো।

লগি-বৈঠা হাতে প্রতিরোধী জনতার সাথে ১৪ দলের নেতাকর্মিবৃন্দ
লগি-বৈঠা হাতে প্রতিরোধী জনতার সাথে ১৪ দলের নেতাকর্মিবৃন্দ

২৮ অক্টোবর সকাল থেকেই মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ারের প্রতীক লগি-বৈঠা নিয়ে রাজধানীর পল্টন ময়দানে জনসমাবেশ ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন ১৪ দলের নেতা শেখ হাসিনা। মানুষ আগের দিন থেকেই সমবেত হওয়া শুরু করেছিলো। এটা ছিলো স্বতঃস্ফূর্ত জনস্রোত। রাজনীতির ময়দানে যারা সক্রিয় নন, এমন সব পেশাজীবী ঘরোয়া মানুষগুলোও সেদিন রাস্তায় নেমে এসেছিলেন কেবল ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে। ২৮ অক্টোবর পল্টন ময়দানে জনসমাবেশ হওয়ার কথা ছিলো।

আগের দিন সন্ধ্যার পর বিএনপি-জামাত ক্যাডাররা পল্টন ময়দান দখল করার পাঁয়তারা চালায়। ১৪ দলের সাহসী যুবারা সেদিন মাঠ উদ্ধার করেছিলো পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে। কিন্তু ২৮ অক্টোবর সকালেই পল্টন ময়দানে ১৪ দলের পূর্বঘোষিত সমাবেশের উপর ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। পল্টন ময়দান পুলিশের দখলে চলে যায়। এদিকে কোনোপ্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটের সামনে মঞ্চ নির্মাণ করে সমাবেশ শুরু করে জামাত-শিবির।

সকাল থেকেই তাদের অঙ্গ সংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী উস্কানিমূলক গান শুরু করে। তার ফাঁকে ফাঁকে জামাতের নেতারা উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখতে শুরু করে। পল্টন ময়দানে ১৪৪ ধারা জারি করার ফলে স্বাধীনতার পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত জনস্রোত অবস্থান নিতে থাকে গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, মুক্তাঙ্গন, পুরানা পল্টন মোড়, তোপখানা রোড, বিজয়নগর, কাকরাইলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে।

তারই ঠিক পাশে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামাতের এই উস্কানি সমাবেশ আয়োজনের অর্থই ছিলো ইচ্ছাকৃত সংঘাত সৃষ্টি একথা বুঝতে আমাদের বিন্দুমাত্র বাকি ছিলো না। কিন্তু পরিস্থিতির অনিবার্যতার কারণে সমবেত জনতার সামনে অন্য কোনো পথও খোলা ছিলো না। কারণ স্বাধীনতা-গণতন্ত্র রক্ষায় বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালেও মরণপণ যুদ্ধ করেছে, সেই বাঙালি জাতি সেই স্বাধীনতাবিরোধীদের চোখরাঙানিতে মাথা নোয়াবে কেন?

মাথা নোয়ায়নি সেদিন বাঙালি। বরং উস্কানিমূলক সশস্ত্র হামলা প্রতিরোধ করেছিলো কেবলমাত্র লগি-বৈঠার জোরে আর আদর্শ ও দেশপ্রেমের দৃঢ়তায়। একের পর এক মিছিল আসছিলো, কোথা থেকে এসব মানুষ এসেছেন সেদিন তা হয়তো কোনো নেতাও জানেন না। কারণ সংগঠিত কর্মীবাহিনীর চাইতে অনেক অ-নে-ক বেশি মানুষ এসেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। দুপুরের আগেই হঠাৎ করে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামাত-শিবিরের জমায়েত থেকে উস্কানিমূলক স্লোগানের সাথে সাথে স্বতঃস্ফূর্ত জনতার উপর হামলা চালানো হয়। অস্ত্র-গুলির মুখে মানুষকে সেদিন ওরা জিম্মি করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলো। ওদের মঞ্চ থেকে ওদের নেতারা মাইকে বারবার ঘোষণা দিতে থাকে “বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করো, মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী”। ওদের হায়েনা বাহিনী নেতাদের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। ওরা গুলি চালায়, মুহুর্মুহু বোমা বর্ষণ করতে থাকে। আর বিপরীতে কেবলমাত্র লগি-বৈঠা নিয়েই প্রাণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে হায়েনাদের বিরুদ্ধে।

জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের গুলিতে নিহত যুব মৈত্রী নেতা শহিদ রাসেল আহমেদ খান
জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের গুলিতে নিহত যুব মৈত্রী নেতা শহিদ রাসেল আহমেদ খান

জামাত-শিবিরের ক্যাডাররা গুলি করে হত্যা করে যুব মৈত্রীর খিলগাঁও থানা যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল আহমেদ খানকে। রাসেলের মতো নিবেদিতপ্রাণ ও আদর্শের প্রতি সৎ-অবিচল কমরেড খুব কমই দেখেছি। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার পাঠান পাইকপাড়া গ্রামের ছেলে রাসেল। অল্প বয়সে মাকে হারান। কঠোর দারিদ্র্য আর সৎ মায়ের পারিবারিক দ্বন্দ্বে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই লেখাপড়া ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন রাসেল।

ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্র মৈত্রীর রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ঢাকায় এসে কঠোর জীবনযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। কখনো পরের দোকানে কাজ করে, কখনো গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে জীবন চালাতেন। কিন্তু এতো কঠোর জীবনের টানাপোড়েনেও আদর্শ-রাজনীতি-পার্টিকে ত্যাগ করতে পারেন নি রাসেল।

টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন নামে একটি শ্রমিক সংগঠনের কাজের সাথেও যুক্ত হন রাসেল। পার্টির কাজের প্রতি এতোটাই নিষ্ঠাবান ছিলেন যে অনেক দায়িত্বশীল সিনিয়র নেতাও এতোটা পারেন না। অনেকেই আছেন, পার্টির কর্মসূচিতে এসে পকেটে টাকা না থাকলে যাওয়ার আগে নেতা বা সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে দুই-দশ টাকা নিয়ে বাসায় ফেরেন। কিন্তু রাসেল কারো কাছ থেকে হাত পেতে কোনোদিন টাকা নেননি। শূন্য পকেটে প্রায়ই পল্টনের পার্টি অফিস থেকে পায়ে হেঁটে রামপুরার বাসায় যেতেন। কখনো হার মানেননি রাসেল।

২৮ অক্টোবরও রামপুরা থেকে রাসেল পায়ে হেঁটে প্রতিরোধ লড়াইয়ে পল্টনে আসতে চেয়েছিলেন। রামপুরা থেকে স্বাধীনতার পক্ষের একটি মিছিল আসছিলো পল্টনের দিকে। একা একা হেঁটে না এসে ওই মিছিলের পিছন পিছন হেঁটে চলে আসেন। সবাই যখন পল্টন মোড়ের এপার থেকে ইট-পাথর-লগি-বৈঠা হাতে প্রতিরোধ করছিলেন জামাতীদের অস্ত্র-গুলি-বোমা হামলা, সাহসী রাসেল তখন দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন অনেকটা। সিপিবি অফিস পার হয়ে একেবারে জামাতীদের মঞ্চের কাছাকাছি, কেবল একটা বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে। খুব কাছ থেকে জামাতীরা তাঁর মাথায় গুলি করে। কয়েকজন সহযোদ্ধা তাঁকে উদ্ধার করে সাংবাদিকদের গাড়িতে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ছোটেন। না, রাসেল সেদিনও হারেন নি। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টাকে পরাস্ত করে রাসেল নিজের জীবন দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামকে আরো এক বড় ধাপ এগিয়ে দিয়েছিলেন।

রাসেলের মৃত্যুর পর আরেক নাটকীয় ঘটনা ঘটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ওর মরদেহ ছিনতাই করতে চেয়েছিলো জামাতীরা। নিজেদের কর্মি বলে দাবি করে ঢাকা মেডিকেলের মর্গ থেকে রাসেলের মরদেহ ওরা দখল করে নিতে চেয়েছিলো। সশস্ত্র জামাত ক্যাডারদের হাত থেকে সেদিন রেনু বেগম নামে ওয়ার্কার্স পার্টির এক নেতা দুর্দান্ত সাহসে শহীদ রাসেলের মরদেহ রক্ষা করেছিলেন। এমন দুর্দান্ত সাহসী আরো কয়েকজন সেই মুহূর্তে মর্গের কাছে থাকলে হয়তো আরো সত্যি প্রকাশিত হতো। জামাত-শিবিরের দাবি অনুযায়ী তাদের পক্ষের প্রকৃত লাশ হয়তো ৬টি থেকে আরো কমে যেতে পারতো। কারণ অস্ত্র-গুলি-বোমার বিরুদ্ধে কেবল লগি-বৈঠার প্রতিরোধের অসম লড়াইয়ে এ ছাড়া আর কীই বা হতে পারে!

এ ঘটনার পরও খালেদা জিয়া তার বশংবদ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সাথে মন্ত্রণা করে সাংবিধানিক বিধিবিধান পায়ে দলে ইয়াজউদ্দিনকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে বসিয়ে দেন। কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয় নি। গণআন্দোলনের মুখেই কেএম হাসান সরে দাঁড়ান। অপসারিত হন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ আজিজ। যদিও আরেক অসাংবিধানিক জগদ্দল পাথর ফখরুদ্দিন আহমেদকে পর্দার সামনে রেখে আবারো অগণতান্ত্রিক পথে দেশ শাসনের ভার পিছন থেকে তুলে নেয় সেনাবাহিনী। তাদের আরো দুই বছরের শাসনাবসানে অবাধ শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্র ও জনগণের শাসনভার আসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ১৪ দলের হাতে। এ পথে নিশ্চিতভাবেই শহিদ রাসেল আহমেদ খানের রক্তের দাগ লেগে আছে। কিন্তু ২৮ অক্টোবরের সেই খুনীদের বিচার এখনো অধরা রয়েই গেছে। আমরা সেদিনের সেই খুনীদের বিচার চাই।

২৮ অক্টোবরের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জনগণের সেই প্রতিরোধ সংগ্রামকে বিএনপি-জামাত চক্র ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে চলেছে এই ১৩ বছর ধরে দেশে-বিদেশে। জনতার প্রতিরোধ সংগ্রামকে দমন করতে তাদের অস্ত্র-গুলি-বোমার ব্যবহারকে আড়াল করে একে কেবল লগি-বৈঠার সহিংসতা বলে আখ্যা দেয় ওরা। সেই সময়ে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের (যদিও জনপ্রতিরোধে একতরফা সেই নির্বাচন আর আয়োজন করতে পারেনি বিএনপি-জামাত-ইয়াজউদ্দিন-আজিজ গং) প্রচারকাজে ‘সহিংসতার ভিডিওচিত্র’ বানিয়ে প্রচার করা হয়েছে গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-জনপদে। রাজধানীতে বিদেশি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সেই ‘বানানো ভিডিওচিত্র’ ওরা প্রদর্শন করেছিলো। এখনো সেখান থেকে স্থির চিত্র বানিয়ে বানিয়ে যখন যার প্রয়োজন, তার ছবি ফটোশপে সংযোজন করে অনলাইন-অফলাইনে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে ওরা। রাজাকার কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠা মাত্রই ওই জঙ্গিবাদী গং তাদের কর্তব্য স্থির করতে দেরি করে নি।

তাদের বিশ্বস্ত প্রচার মাধ্যম ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকা মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই আন্দোলনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত কেচ্ছা-কাহিনী প্রচার করা শুরু করে। এমনকি শাহবাগের নেতৃত্বের সারিতে থাকার কারণে আমার বিরুদ্ধেও সাড়ে ছয় বছর পরে এসে ‘লগি-বৈঠার সহিংসতার খুনী’ হিসেবেও সুপরিকল্পিত অপপ্রচার চালায় ধারাবাহিকভাবে। কিন্তু সরকার পক্ষে কর্তব্য স্থির করতে একটু দেরি হয়ে যায়। ফলে শাহবাগের একেকজন নেতৃত্বকে রং মাখানোর পর পুরো আন্দোলনকেই রং মাখিয়ে ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামে এক নয়া জঙ্গি প্লাটফরমের জন্ম হয়ে যায়।

২৮ অক্টোবরের বার্ষিকী এলেই বারবার ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধে লাগাতার অপপ্রচার অনলাইন-অফলাইনে চলে। তাতে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত নই। বরং এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাকে এতো শত-সহস্রবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যে হত্যার হুমকিতে আমার আত্মা কাঁপে না, উল্টো হাসি পায়। কিন্তু এসব ফ্যাসিবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষের একযোগে লড়াইটাই ছিলো কাম্য। কিন্তু সেটা এখন নানা পক্ষের পাওয়া-না পাওয়া আর স্বার্থের হিসাব-নিকাশের খাতায় বন্দী। আজ যখন সেই ঐক্য আরো ইস্পাতকঠিন করা দরকার ছিলো, তখন সেটি না করে উল্টো পাওয়া-না পাওয়ার বিভক্তি আরো জোরদার হচ্ছে প্রতিদিন।

মজার বিষয় হলো, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টন মোড়ে গণপ্রতিরোধে হাজারে হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। তার মধ্যে মাত্র একজন বাপ্পাদিত্যই জামাত-শিবিরের ৬জন ক্যাডারকে খুন করেছিলো! সেদিনের সেই সংগ্রামে অন্য কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে এমন নিবিড় প্রচারণা জামায়াতে ইসলামী আর চালায় না। এর একটা নিগূঢ় কারণ আছে। ইসলাম নিয়ে যারা রাজনীতির নামে ব্যবসা করে, তাদের কাছে একজন ‘বাপ্পাদিত্য বসু’কে খুনী বানানো অনেক বেশি কার্যকরী। তাতে সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি সৃষ্টি করা যায়, দাঙ্গা বাঁধানোর চক্রান্ত করা যায়, মানুষকে সহজেই বোকা বানিয়ে বিভক্ত করা যায়। সেই অপকৌশলই এই ১৩ বছর ধরে জামাত-শিবির-বিএনপি চক্র চর্চা করে আসছে। সেদিনের সেই ঘটনার পরে উভয় পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিলো।

এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে জামাত-শিবিরের কর্মিদের হত্যা করার পরও ওরা মামলার আসামী হওয়ার হাত থেকে ‘বাপ্পাদিত্য বসু’ নামের কোনো ‘লাভজনক প্রতিপক্ষ’কে রেহাই দেবে। ‘বাপ্পাদিত্য বসু’ খুনী হলে কেন আমাকে সেদিন মামলার আসামী করা হলো না? সেই মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছিলো। কেন সেদিন বর্ধিত এজাহারে কিংবা চার্জশিটের বিরুদ্ধে না-রাজি পিটিশনে আমাকে আসামী করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় নি? এসব আইনী সুবিধাবলি আমাদের চাইতে জামাতীরা খুব ভালভাবেই বোঝে। আসল কথা হলো তুরুপের তাস হিসেবে ‘বাপ্পাদিত্য বসু’কে খুনী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। সেই ‘দৈনিক সংগ্রাম’, ‘নয়া দিগন্ত’ থেকে ‘আমার দেশ’ হয়ে এখন অনলাইনে, ফেসবুকে।

ব্যক্তি ‘বাপ্পাদিত্য বসু’ কোনো ব্যাপার না। একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা অনেক সহজ। আমাদের পূর্বপুরুষেরা মুক্তিযুদ্ধ করে আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে নিজ প্রাণের মায়া উপেক্ষা করে দেশের জন্য লড়াই করতে হয়। আমরা সেই আদর্শে বলীয়ান। লড়াই থেকে আমরা এক চুলও পিছিয়ে আসবো না। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতন্ত্র রক্ষায় আমাদের চলমান লড়াই নিশ্চয়ই অব্যাহত থাকবে। যেমন লড়ে গেছেন শহিদ রাসেল আহমেদ খান।
২৮ অক্টোবরের লড়াইয়ের চেতনা চিরজীবী হোক।

লেখক:বাপ্পাদিত্য বসু, সমন্বয়ক, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা; সাধারণ সম্পাদক, ইয়ুথ ফর ডেমোক্রেসি এন্ড ডেভেলপমেন্ট।


  • 153
    Shares
শর্টলিংকঃ