‘অপারেশন ডায়মন্ড’ ইসরাইলের মিগ ২১ চুরির একটি সফল অভিযান !

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুরু হয় সোভিয়েত ইঊনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ ও সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রস্তুত করে মিগ-২১ নামে এক অসাধারণ যুদ্ধবিমান। যাতে টুমান্সকাই আর-২৫ টার্বোজেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছিল যা ১৫৬৫০আইবিএফ শক্তি উৎপন্ন করতো ফলে যুদ্ধবিমান টির গতি ছিল প্রায় ২ম্যাক ও ম্যানওভ্যারিটি ছিল অসাধারণ।


১৯৬০সালের দিকে ইসরাইল নিয়ে ঝামেলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা শুরু করে যেমন, সিরিয়া, মিশর ও ইরাক। স্বাভাবিক ভাবেই এইসব দেশের প্রধান লক্ষ্য ছিল, ইসরাইলকে কাউন্টার করা । ইসরাইলের হুমকি হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়ান মিগ ২১ বিমান !

ইসরাইলের সরকারের প্রধানরা নিজেদের আকাশ নিরাপত্তার বিষয়ে চিন্তিত হয়ে পরে তারা অনেক চেষ্টা চালিয়ে যায় মিগ সম্পর্কে তথ্য নিতে মোসাদ কে মিগ-২১ যুদ্ধবিমানের শক্তি ও দুর্বলতা ব্যাপারে সব তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দেয়।অনেক চেষ্টার পর মোসাদ একটি দু:সাহসিক অপারেশনের পরিকল্পনা গ্রহন করে যাতে অত্যন্ত গোপনে শত্রু দেশ মিশর থেকে একটি মিগ-২১ যুদ্ধবিমান চুরি করে ইসরাইলে নিয়ে আসা হবে। এই অপারেশন টির কোড নেম দেওয়া হয় ” অপারেশন ডায়মন্ড “।

প্রথমে মোসাদ তাদের ২ এজেন্ট কে মিশরে পাঠায় এই অপারেশন সম্পন্ন করার জন্য কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২ জনই ধরা পরে যায় ও মিশন ব্যর্থ হয়। তবে মোসাদ ত আর বসে থাকবেনা কিছুদিন পরে আবার চেষ্টা চালায় এবার টার্গেট আরেক শত্রুদেশ ইরাক ! মোসাদ দুইজন ইরাকী পাইলট কে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে হাত করে নেয় কিন্তু শেষ সময়ে একজন পাইলট বেঁকে বসে ফলে আবার ও অপারেশন ব্যর্থ হয়।


তবে মোসাদ এতে দমে না গিয়ে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে থাকে ও ১৯৬৪সালে দিকে একজন ইরাকি বংশভুত সুন্দরী ইহুদী মহিলা এজেন্ট কে এই অপারেশনের দায়িত্ব দেয়। অত্যন্ত সুন্দরী ও বুদ্ধিমান এই মহিলাটি ইরাকী এক তরুণ পাইলটের সাথে ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্ক করে । সেই পাইলট ছিল খ্রিস্টান ধর্মীয় কারনে তার পদন্নোতি হচ্ছিল না তাই সে মনের দুঃখে চাকরি ছেড়ে দেবে বলে ঠিক করেছিল।

মোসাদের নির্দেশে সেই মহিলা এজেন্ট রেডফাকেই তার দুর্বলতার সুযোগে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ও তাকে নিয়ে একান্তে সময় কাঁটাতে ইউরোপ আসে ও মোসাদের সাথে তার যোগাযোগ করিয়ে দেয়। মোসাদ তাকে তৎকালীন সময়ে ১০লক্ষ মার্কিন ডলার ও তার পরিবার সহ তাকে ইউরোপে পুনর্বাসনের প্রস্তাব দেয় যা রেডফা প্রথমে এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি ! কিন্ত পরে সে এই প্রস্তাব মেনে নেয় । মোসাদ তাকে পরিকল্পনার ব্যাপারে বিস্তারিত বুঝিয়ে আবার ইরাকে পাঠিয়ে দেয়। রেডফা আবার তার কাজে যোগ দেয় ও সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে।

১৬আগস্ট, ১৯৬৬ রেডফা তার সুবর্ন সুযোগ পেয়ে যায় যখন জর্ডানের ট্রেনিং মিশনের জন্য সহ একটি মিগ-২১ এর পাইলট হিসাবে তাকে নিযুক্ত করা হয়।রেডফা আগে বিমানটি ফুললোড করে ! মিগ-২১ সহ আরো কিছু ইরাকি যুদ্ধবিমান জর্ডানের উদ্দেশ্যে রওনা হয় কিন্তু ইরাকের আকাশ সীমা অতিক্রম করে বিমান গুলো জর্ডানের আকাশ সীমায় প্রবেশ করার কিছুক্ষণ পরেই রেডফা তার মিগ-২১ নিয়ে ফর্মেশন ভেঙ্গে ইসরাইলের দিকে চলে যেতে থাকে ।

জর্ডানের নিরাপত্তা বাহিনী রেডফা কে সতর্ক করে কিন্তু রেডফা তাদের কথায় কান না দিয়ে পরিকল্পনা অনুসারে ফুলস্প্রিডে বিমান চালাতে থাকে ! জর্ডান নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নেয় ও তাদের দুইটি হান্টার যুদ্ধবিমান কে মিগ-২১টির পিছনে লাগিয়ে দেয় যাতে রেডফা জর্জনের আকাশ সীমা পার হতে বাধাপ্রাপ্ত হয় এদিকে মিগ-২১এর জ্বালানিও প্রায় শেষ হতে থাকে।

কিন্তু মিগ-২১ এর সর্বোচ্চ গতির কাছে হান্টার দুইটি হার মানে শেষে নিরাপত্তাবাহিনী তাদের এন্ট্রি এয়ার ডিফেন্সের ব্যবহার করে কিন্তু সেটিও লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হয়। রেডফা তার মিগ যুদ্ধবিমান টি নিয়ে সুরক্ষিত ভাবেই ইসরাইলের আকাশ সীমায় প্রবেশ করে ও ইসরাইলের দুটি মিরেজ যুদ্ধবিমান মিগ কে পথ দেখিয়ে হাটজার বিমানবন্দরে নিয়ে আসে।


আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনার পর আলোড়ন পড়ে যায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁদের প্রযুক্তি আমেরিকার হাতে যাওয়ার ঝুঁকিতে পরে ও ইসরাইলের কাছে তাদের মিগ যুদ্ধবিমান টি ফেরত চায় যা ইসরাইল দিতে অস্বীকার করে। ইসরাইলের পাইলট ও ইঞ্জিনিয়াররা এরপর মিগ-২১ টি চালিয়ে এর বৈশিষ্ট্য ও গতিবেগ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারনা পেয়ে যায় যা তাদের ছয়দিনের যুদ্ধের সময় ব্যাপক ভাবে কাজে লাগে।

১৯৬৮সালে ইসরাইল আমেরিকাকে এই মিগ-২১টি লিজে দিয়ে দেয় যা আমেরিকা তাদের দেশে নিয়ে যায় ও যন্ত্রপাতি খুলে বিভিন্ন রুশ প্রযুক্তি হস্তগত করে ও পরে আবার যুদ্ধবিমানটি ইসরাইলকেকে দেয়। আজও ইসরাইল এয়ার ফোর্সের মিউজিয়ামে এই ইরাকী মিগ-২১ যুদ্ধবিমান টি সাজিয়ে রাখা আছে মোসাদের এক অনন্য কীর্তির নিদর্শন হিসাবে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
শর্টলিংকঃ