মুক্তিযুদ্ধে শমশেরনগরে বিদ্রোহ

  • 7
    Shares

ইমরান আহমেদ চৌধুরী:

থ্রি উইং ইপিআরের উইং কমান্ডার ২৪ মার্চ রাতে ডেকে বললেন, ‘চৌধুরী সাব, গেট ইওর কোম্পানি রেডি। এনটিএমটু (নোটিশ টু মুভ) আওয়ার। গো অ্যান্ড সিকিউর শমশেরনগর এয়ারপোর্ট। এইএসডিউটি (ইন্টারনাল সিকিউরিটি ডিউটি)। রিপোর্ট বাই টুমরো লাস্ট লাইট। টুআইছি ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল উইল জয়েন ইউ সুন।

বি রেডি টু রিসিভ হিম। টেক অল অ্যাভেইলেবল ম্যানপাওয়ার। থ্রি থ্রি টন ট্রাক অ্যান্ড ওয়ান পিকআপ। ফার্স্ট লাইন পাউছ এমুনেশন। গো এএসএপি।

আপকি ওপর হামারা বহুত ভরসা হ্যাঁয়। ইয়ে শালা মালাউন লোগোকি ইয়ে সব বন্ধ হনা চাইয়ে। নেহি তো বহুত পস্তানা প্যাঁরেগি ইয়ে সব কাফির কো।

এইসে লেসন দেনা হ্যাঁই, তাক্রিবান কাভি বি ইয়ে পাকিস্তান তোর নে কি আওয়াজ নিহে লে না প্যাঁয়ে–আপনে শামযহে না মেরে বাত।’

যা বলা তাই কাজ। মনে মনে খুশিও। সদর দপ্তর থেকে বের হয়ে যেতে পারছি, এটাই সৌভাগ্য বলতে হবে। পাঞ্জাবি উইং কমান্ডার মেজরের কথায় মেজাজটা একদম খারাপ হয়ে গেল।

২৪ বছর এক সঙ্গে থেকেও ওরা ভাবছে আন্দোলন বাঙালি হিন্দুরাই করছে। মুসলমানরা এর মধ্যে নেই অথবা ওদের চোখে আমরা এখনো পুরোদমে মুসলমান নয়! মনে হচ্ছিল, কষে গালে থাপ্পড় মারতে পারলে ভালো হতো।

ওর কথায় বোঝা গেল পরিষ্কার। ওরা আমাদের কতটা অবমাননার চোখে ও ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। কোনো কথা না বলে স্যালুট দিয়ে বেরিয়ে এসে প্লাটুন কমান্ডার ও কোম্পানি হাবিলদার মেজরকে ডেকে পাঠালাম। ডেকে এনে সব ব্রিফিং দেওয়া হলো। এক ফাঁকে রুমে গিয়ে পারসোনাল পয়েন্ট থ্রি টু স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন পিস্তলটা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসি।

এসে ব্যাটম্যান বাতেনকে সব বেডিং ও স্যুটকেস আইএস ডিউটিতে যাওয়ার জন্য তৈরি করতে বলি। অর্ডার দিয়ে বেরিয়ে পড়ি সাদা পোশাকে। পরিস্থিতি জানার জন্য ব্লু বার্ড ৩ উইং সদর দপ্তর থেকে একটা রিকশা নিয়ে শহরে চলে যাই। অনেক রাত করে ফিরে এসেই ঘুমিয়ে পড়ি। শহরে গুজব আর গুজব। ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট খাদিম নগরে ক্যাম্প করেছে।

শহরে টহল দিচ্ছে অবিরাম। জিন্দাবাজার এলাকায় মিছিল–মিটিং নিষিদ্ধ। হালকা ১৪৪ ধারার মতো। রাত নয়টার ভেতর সব দোকানপাট বন্ধ। শহর প্রায় খালি। প্রাণহীন রিকাবিবাজার, মেডিকেল কলেজ, আম্বরখানা—সব যেন কেমন থমথমে।

আখালিয়া থেকে তিন থ্রি টন ভর্তি সৈনিক আর ও শেভ্রলে পিকআপে চারজন আর সামনে চালক রফিক আর আমি। জমাদার স্পিং গুল প্যারেড বুঝিয়ে দিল। ৯১ জনের কাফেলা ধীরগতিতে বের হয়ে গেল। কোতে নায়েক ঝুম্মা খান অস্ত্রশস্ত্র দিতে কিছুটা গড়িমসি করছিল। কোম্পানি কমান্ডারের ধমকে ঘাবড়ে গিয়ে সব দিয়ে দিয়েছে।

রেশন ওঠানো হলো প্রায় ১৮ দিনের। বাকিটা জুড়ি অথবা তেলিয়াপাড়ার কোম্পানি থেকে নিয়ে আসা যাবে। ২০ দিনের ফোর্সের পয়সা নগদ দিল উইং কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার তাজ মোহাম্মাদ ভাট। লোকটা বেয়াদব কিসিমের মানুষ। ঠিক সকাল সোয়া আটটায় ‘ওকে’ রিপোর্ট দিয়ে৩ উইং ইপিআরের ব্রাভো কোম্পানি ৯১ জনকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

থেকে গেল ২১-২২ জন। আর ছুটিতে ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে মিলিয়ে আরও ১০ জনের মতো। ভিন্ন নতুন দুটি ইউনিট দাঁড় করানোর জন্য অনেক সৈনিক ওই দুটো উইং থেকে চলে গেছে। কোম্পানির লোকবল কম। সামনের পিকআপে আমি, সব পেছনে থ্রি টনে জমাদার গুল।

শহর একদম ঠান্ডা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। পুরোনো মেডিকেল কলেজ-চৌহাট্টা মোড় ঘুরে জিন্দাবাজার-কোর্ট কাচারি। এরপর সরীসৃপের মতো ওঠা গেল দেশ বিখ্যাত কিন ব্রিজে।

রাস্তা খালি-পিচ ঢালা পথ শেষ। ফেঞ্চুগঞ্জের রাস্তায় হেরিংবোন খানাখন্দর পাড়ি দিয়ে এগোতে থাকি ফেঞ্চুগঞ্জের উদ্দেশ্যে।

ইচ্ছা করেই প্রধান সড়কে না গিয়ে ভিন্ন পথে আসা। রোড বন্ধ, গাছ ফেলে রাখায় অনেক রাস্তাই তখন বন্ধ। অল্প দূরত্বের মংলাবাজার স্টেশন পর্যন্ত আসতে লেগে যায় প্রায় এক ঘণ্টা।

গাড়ির বহর থামিয়ে, বিশ্রাম দিয়ে, চা পান করে নিতে হলো। আশপাশের রাস্তার খোঁজখবরও সব জেনে নেওয়া হলো।

থমথমে পরিস্থিতি, সবার চোখেই কেমন যেন আতঙ্কের ভাব। স্টেশন মাস্টার এসে জানালেন, আখাউড়া থেকে সায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন অনেক জায়গায় উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। উত্তাল সময় বাংলার জনপদে। ফরহাদ হাবিলদারকে ডেকে মেজর জি কানে কানে জিজ্ঞেস করেন, ওরা কয়জন?

হাতে গুনে জানায়, স্যার একজন জেসিও, তিন এনসিও আর ছয় সেপাই পাঞ্জাবি, পাঠান, বালুচ আর বিহারি মিলিয়ে। ফিলিপস ছয় ব্যান্ডের রেডিওটা অনেক কষ্টে অন করে সকাল সাড়ে দশটার বিবিসি শোনার ইচ্ছে জাগে। মার্ক টালির সকালের খবরটা শোনার চেষ্টা করেও পারা গেল না।

বেলা ১১টার সময় আবার যাত্রা শুরু। দুই ঘণ্টায় আট নয়টা ব্যারিকেড সরিয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ পৌঁছি। গাড়িগুলো দেখলেই হুড় হুড় করে লোকজন একত্র হচ্ছিল। আর স্লোগানে স্লোগানে এলাকাটাকে মুখরিত করে তুলছিল। কৃষক, বৃদ্ধ, আবাল–বনিতা সবাই সরব। অত্যন্ত বিশাল বাজার।

নদীর পাড় ঘিরে গড়ে উঠেছে এক নতুন শহর। টিনের দোতলা-তিনতলা আড়ত, গদি ঘর, দোকান। নদীর ঘাটে অনেক নৌকা, লঞ্চ, আর কার্গো জাহাজে জনাকীর্ণ। একটা রেস্তোরাঁয় অফিসারদের মধ্যাহ্ন ভোজ সাঙ্গ হলো। কোম্পানি কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার গনি।

অনেক বছর যাবৎ এই কোম্পানিতে। পুরোনো ইপিআরের প্রায় লেখাপড়া না জানা। তবে অত্যন্ত পেশাদার সৈনিক। ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে রাজনাগর ফেলে দুপুর সাড়ে তিনটায় শমশেরনগর এয়ারপোর্ট। গেট খুলে দিল এমওডি সৈনিক। দেখে মনে হলো মণিপুরি বা ত্রিপুরা জাতীয়।

ম্যানেজার গোছের একজন লোক এসে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানালেন। জানা গেল, শহরের ডাক বাংলোতে আরই বেঙ্গল রেজিমেন্ট এসে পৌঁছেছে-এই দিকে আসে নাই এখনো!

(মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ফজলুল হক চৌধুরীর ৪৬ বছরের পুরোনো ডায়েরি অবলম্বনে)


  • 7
    Shares
শর্টলিংকঃ