‘সাম্রাজ্য’ পুনরুদ্ধারে ক্যাসিনো খালেদ বাহিনীর মরণকামড়!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইউএনভি ডেস্ক:

‘খালেদ ভাই (ক্যাসিনো খালেদ) গ্রেপ্তার হওয়ার পর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিছিলি কেন? এইবার দেখ তোর কী করি।’ এরপর যার ওপর হামলা হলো বয়সে সে নিতান্তই কিশোর। নির্যাতনের খড়্গ চালানো হচ্ছে খালেদের টর্চার সেল ভাঙচুরের কথা বলেও। খালেদ গ্রেপ্তার হলে গা-ঢাকা দিয়েছিল তার ক্যাডাররা। ফিরে এসে এখন তারা সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে মরিয়া। হত্যাচেষ্টা চালাতেও হাত কাঁপছে না তাদের। উদ্দেশ্য একটাই—হারানো সাম্রাজ্য পুনর্দখল।

সবুজ একতলা ভবন। নিরিবিলি ও ছায়াঘেরা। তবু ভবনটি দেখে শিউরে ওঠে স্থানীয় অনেকে। কারণ এটিই ছিল ঢাকা দক্ষিণ মহানগর যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার টর্চার সেল। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর র‌্যাবের হাতে খালেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর এলাকাবাসী টর্চার সেলটিতে ভাঙচুর চালালে সেখানে বিট কার্যালয়ের সাইনবোর্ড টাঙায় পুলিশ। এখন শুধু তিন কক্ষের টর্চার সেলই নয়, খালেদের অপরাধের পুরো সাম্রাজ্যই পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া তাঁর ক্যাডার বাহিনী। খালেদ গ্রেপ্তার হওয়ার দৌরাত্ম্য বন্ধ ছিল। সম্প্রতি আবারও তারা নিজেদের কবজায় নেওয়া শুরু করেছে সব কিছু। এরই মধ্যে খিলগাঁওয়ের বিভিন্ন বাজার, ফুটপাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজি শুরু করেছেন। তাদের এই অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়নি অসহায় মুচি ও পঙ্গু চা-দোকানিও।

জানা গেছে, খালেদ গ্রেপ্তার হলে গা-ঢাকা দিয়েছিল তাঁর ক্যাডাররা। এক রকম স্বস্তি ফিরেছিল রাজধানীর শাহজাহানপুর-খিলগাঁও এলাকায়। গত রমজানে ইফতারসামগ্রী বিতরণের নামে খিলগাঁওয়ে প্রবেশ করে ছিনতাইকারী কবীর, পল্টি রিপন, শ্যুটার সজিব, রিজভি হাসান রিভি ও মনিরুজ্জামান ওরফে টোকাই সুমনসহ কয়েকজন। এরপরই তাদের হামলা-গুলিতে আহত হয়েছেন কয়েকজন কেউবা আবার তাদের ভয়ে এলাকা ছেড়েছেন এরই মধ্যে। তাঁদের একজন হাইকোর্টের মুহুরি মো. মাহবুবুর রহমান জুয়েল।

গত ২৫ মে খিলগাঁওয়ের ঝিলপাড় এলাকায় বসে জুয়েল কালের কণ্ঠকে শোনান খালেদের ক্যাডারদের নির্যাতন চালানোর ঘটনা। গত ৫ মে বিকেলে ঝিলপাড়ে বন্ধুদের সঙ্গে বসে ছিলেন তিনি। খালেদের অনুসারী ছিনতাইকারী কবীরের নেতৃত্বে কয়েকজন এসে টর্চার সেল ভাঙচুরের জন্য দায়ী করে গালাগাল শুরু করে। জুয়েল প্রতিবাদ করলে কবীর ও তার সহযোগীরা তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। এ ঘটনায় ওই দিনই শাহজাহানপুর থানায় জিডি করেন জুয়েল। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।

জুয়েল বলেন, খালেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর টর্চার সেল ভাঙচুর করে এলাকাবাসী। এরপর সেখানে পুলিশ সাইনবোর্ড টাঙালেও তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। সেই সুযোগে এখন আবার টর্চার সেলটি দখলের চেষ্টা করছে খালেদের ক্যাডাররা। এ ছাড়া যারা টর্চার সেলটি ভেঙেছে, তাদের হাত কেটে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ছিনতাইকারী কবীর। এরপর ভয়ে এলাকার অনেকেই আত্মগোপন করেছে।

একই বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছেন গোড়ান এলাকার জয়নাল আবেদীনের ছেলে ও ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। গত ১৫ মে পল্টি রিপনের নেতৃত্বে টোকাই সুমন, রাসেল ওরফে চাপাতি রাসেল, মঞ্জুরুল ওরফে কচি, উজ্জল, পল্টি রিপনের ভাগ্নে জাহিদ, বন্ধু কবির, ডালিম, মামুন ওরফে চান্দি মামুনসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো কয়েকজন সাইফুলের ওপর হামলা চালায়। খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে রেমন্ড টেইলার্সের সামনে তারা প্রকাশ্যে সাইফুলকে পিটায় এবং বুকে, পেটে, পিঠে তিনটি গুলি করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। লোকজন দ্রুত সাইফুলকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

পূর্ব গোড়ানের ৯ নম্বর সড়কের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে আছেন সাইফুল। বুক-পেট-পিঠ সাদা ব্যান্ডেজে ঢাকা। পাশে বসে অঝোরে কাঁদছেন স্ত্রী সুমী। সাইফুলের একমাত্র ছেলে ১১ বছরের মেহরাব হাসান সাইফানও মুষড়ে পড়েছে। ছেলের দিকে ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন সাইফুল। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই কেঁদে ফেলেন তিনি। বলেন, ‘ছেলেটাকেও আর আদর করতে পারি না। শুয়ে-শুয়েই দিন কাটাতে হয়, এভাবেই বেঁচে আছি কোনো রকমে। খালেদের ক্যাডাররা আমাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরাতে গিয়ে মেরেই ফেলতে চেয়েছিল। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘গত ১৫ মে সন্ধ্যায় সড়কে পথ আটকে আমার বুকে-পেটে পিস্তল দিয়ে দুই রাউন্ড গুলি করে পল্টি রিপন। আর টোকাই সুমন আমার পিঠে গুলি করেছে। ঘটনার পরদিনই আমার স্ত্রী সবুজবাগ থানায় মামলা দায়ের করেছে। মামলাটির তদন্তভার পেয়েছে ডিবি। এখন পর্যন্ত মঞ্জুরুল ওরফে কচি ছাড়া অন্য কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় খুবই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। সুযোগ পেলেই তারা আবারও আমার ওপর হামলা চালাতে পারে।’

সাইফুলের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির মতিঝিল জোনের এসআই ইসরাইল হোসেন জানান, ডিবি তদন্তভার পাওয়ার পর শরীয়তপুর থেকে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে দুই দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে। রিমান্ডে আসামি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে এখনই সেগুলো জানানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, মামলার অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারে জোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু আসামিরা ঘন ঘন নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলছে। এ ছাড়া আসামিসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরও বন্ধ রাখা হয়েছে। সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে—এই আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আসামি রিপনের বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা সবুজবাগ থানার এসআই রবিন।

খালেদের ক্যাডারদের হামলার হাত থেকে রক্ষা পায়নি কর্মজীবী কিশোরও। আশরাফুল আলম বলে, ‘খালেদ গ্রেপ্তারের পর এ নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিছিলাম। সে জন্য ছিনতাইকারী কবীরের লোকজন ডেকে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যার হুমকি দেয় আমাকে। এরপর ভয়ে এই ঘটনায় মামলাও করতে পারিনি।’

জানা গেছে, মো. কবীর হোসেন রাজধানীর মতিঝিল যুবদলের সাবেক সভাপতি মির্জা কালুর একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। চুরি-ছিনতাইয়ের সুবাদে নামের আগে ‘ছিনতাইকারী’ শব্দ বসে যায়। এরপর ২০১৩ সালে ক্যাসিনো খালেদের মদদে যুবলীগে নাম লেখান কবীর। কয়েক দিনের মধ্যেই বাগিয়ে নেন সাবেক ৩৪ ও বর্তমান ১১ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ সভাপতির পদ। মহাখালীর নিতাই হত্যা মামলার এজহারভুক্ত আসামি তিনি। ক্যাসিনো খালেদের ক্যাডার বাহিনীর প্রধান ছিলেন কবীর। অন্যদিকে জামির হোসেন রিপনও ছিলেন যুবদলের ক্যাডার। তিনি বারবার সঙ্গ পরিবর্তন করায় তাঁর নাম হয়ে যায় ‘পল্টি রিপন’। ক্যাসিনো খালেদের কিলার হিসেবে কুখ্যাত রিপন। বিভিন্ন থানায় তার নামে আছে একাধিক হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও মাদকের মামলা। মহাখালীর নিতাই হত্যা মামলা, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা কাউসার হত্যা মামলা, মতিঝিল থানার আলোচিত নাইটিংগেল হোটেল ডাকাতি মামলা এবং গোড়ান ২ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুলকে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি তিনি। কবীর আর রিপনের কাছেই খালেদের সব অবৈধ অস্ত্র মজুদ থাকত।

শ্যুটার সজিব ২০০৫ সালে বনশ্রীর ক্রিস্টাল কেবল নেটওয়ার্ক অফিসে মিথুন ও টিটু হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। কেবল ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০১৪ সালে মগবাজারের মাহবুবুর রহমান রানা হত্যার সঙ্গেও তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। রিজভি হাসান রিভি ছিলেন ক্যাসিনো খালেদের হেলমেট বাহিনীর প্রধান। খিলগাঁও, বাসাবো, গোড়ান ও শাহজাহানপুর এলাকায় খালেদের মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন টোকাই সুমন। ফুটপাতের দোকান থেকে শুরু করে বাজার, যানবাহন স্ট্যান্ড, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাসাবাড়িতে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ছিল শ্যুটার সজিবের হাতে। খালেদের প্রধান ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত ছিলেন যুবদল ক্যাডার কিসলু। আর ঠিকাদারির টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন উজ্জল ওরফে টেন্ডার উজ্জল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খিলগাঁওয়ের এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘খালেদ গ্রেপ্তারের পর কবীর-রিপনদের কেউই এলাকায় ছিল না। বন্ধ ছিল হানাহানি-মারামারি-চাঁদাবাজি। এতে এলাকাবাসী অনেক শান্তিতে ছিল। গত রমজান মাস থেকে আবারও তাদের উৎপাত শুরু হয়েছে। খিলগাঁওসহ আশপাশের এলাকায় আবারও তারা চাঁদাবাজি শুরু করেছে। প্রতিবাদ করায় এরই মধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতাসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে তারা। এখন ভয়ে কেউ আর তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। আমি নিজেও তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছি।’

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মতিঝিল জোনের ডিসি আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ‘যুবলীগ নেতা সাইফুলের মামলার তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এই মুহূর্তে এর বেশি তথ্য প্রকাশ করতে পারছি না আমরা। আর খিলগাঁও এলাকায় কেউ নির্যাতন-চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। এখন আর এসব কর্মকাণ্ড করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
শর্টলিংকঃ