এ কেমন ঈদ

  • 1
    Share

ঈদ! সরু একফালি ঈদের চাঁদ দেখতে কেউ এবার হুড়মুড় করে ছাঁদে ওঠেনি, মসজিদের মিনারে ঘোষণা দেয়নি রাহাবার-মুয়াজ্জিন। বাতাসে আতরের সুগন্ধ ভাসছে না, রোজা শেষ হবার সাথে সাথেই কবি নজরুলের হৃদয় দোলানো ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’– কোরাসের মুর্ছনা নেই। টিভিতে সুরের ঝলকানি নেই, স্ক্রলে ঈদ জামাত কখন কোথায় হবে, সেই ঘোষণা নেই।

এর বদলে শুধুই ক্ষণে ক্ষণে ঘোষণা আর প্রেসনোট ; যাবেন না, করবেন না, ঘুরবেন না–ইত্যাদি জাতীয় বিধি নিষেধ! ঈদ এবার এসেছে COVID-19 এর ভয়ে, আতংকে আর অস্থিরতায়। কোথাও আতর-জাফরানের মৌ মৌ গন্ধ নেই, মেহেদীর হাত রাঙানোর উৎসব নেই। এবার পাড়া মহল্লায় দুরন্ত বালকদের আতশবাজির শব্দ পর্যন্ত হয়নি।

পবিত্র রমজান জুড়ে মসজিদে তারাবীর গমগম আওয়াজ শোনা হয়নি, হাফেজের সুললিত কণ্ঠে খতম হয়নি। বিশ্বব্যাপী ত্রাস ছড়ানো করোনা ভাইরাস এর মৃত্যু ভয় জেঁকে বসেছে মিন্দানাও থেকে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জে; কা’বা শরীফ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস হয়ে ইস্ট লন্ডন থেকে বায়তুল মোকাররম পর্যন্ত। ঈদ আসলেও পাঞ্জাবী, থ্রি পিস, শাড়ী জুতো কেনার বায়না ধরেনি শিশু, তরুণ কিংবা গৃহবধুরা।

এবার বিক্রেতা আর সেলস কর্মীদের ফেকাসে মুখ দেখলে সত্যি কান্না পেয়েছে অনেকের। বাবুবাজার থেকে খাতুনগঞ্জ, বারোবাজার থেকে সুনামগঞ্জ সবখানে ক্রেতার চেয়ে পুলিশ বেশী, খুশীর চেয়ে বিষাদের কালো ছায়া অনেক দুর বিস্তৃত। ঈদে কচকচে নতুন টাকা ছাপা আর বিতরণের চাপ নেই, পাওয়ার আশাও নেই শিশুদের। সেমাই, কিসমিস বাদাম, চিকন চালের এবার কোন কদর নেই।

চাঁদ রাতে চাঁদনী চকেও নিকষ কালো নিস্তব্ধতা। জামা-কাপড়, সালোয়ার বিক্রেতাদের হাকডাক, ক্রেতাদের দাম-দর, উবার চালকদের ছুটোছুটি, আদুরে সন্তানের বায়না মেটাতে এ দোকানে সে দোকানে ভিড় ঠেলা-ঠেলীর মজা মাটি হয়ে গেছে। করোনার ত্রাসে বিশ্বব্যাপী ‘ঈদ মোবারক’ কোন মতে বেঁচে আছে মার্ক জাকার বার্গের ফেসবুক আর ম্যাসেঞ্জার কিংবা টুইটার আর হোয়াটস এপে।

ঈদ মাটি হয়ে গেছে ঘাম ঝরানো রিক্সাওয়ালা, বাস শ্রমিক, বড়লোকের বাড়ী বানানো নির্মাণ শ্রমিক, বিবি-সাহেবার কাজের বুয়া কিংবা রাস্তার পাশে ঠেলা ধাক্কা খেয়ে জীবন চালানো ফুটপথ যোদ্ধা-সবার। তেজ ওয়ালা বড় সাহেবের ‘হ্যালো ঈদ মুবারক’ কণ্ঠ খুব ই ক্ষীন শোনা যাচ্ছে৷ খাসীর রেজালা, গরুর দোপায়া কিংবা দুম্বার কিমা খাওয়া বড় লোকদের বেশী খাতির এখন হার্ট সার্জন আর সাদা সবুজ মাস্ক পরা ফ্রন্ট ফাইটার ডাক্তার সাহেব কিংবা আইসিইউ থাকা হাসপাতালের সাথে।

কারণ কখন কি হয় বলা যায় না! এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরে পেস্তা বাদামের চেয়ে মাস্কের কদর বেশী, আতর সুগন্ধীর চেয়ে সার্ফ এক্সেল আর স্যাভলনের গুরুত্ব অনেক। ঈদ-উল-ফিতর এ গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধা মায়ের মুখ আর খুনখুনে দাদুর হাসিমাখা চেহারাটা দেখার জন্য প্রতিবারের মত কমলাপুর কিংবা গাবতলীতে কোটি যাত্রীর সেই চির ‘রাত জাগানিয়া’ দীর্ঘ লাইন চোখে পড়েনি এবার।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিংবা পুলিশের পিটুনি খেয়েও যারা ঢাকা থেকে রংপুর কিংবা সিলেট থেকে আজমপুর পর্যন্ত মাছের ড্রামে লুকিয়ে ‘ব্লাক মার্চ’ করেছেন, সেসব দুর্ভাগারা মাঝ নদীতেই সারা রাত ভেসে থাকবে কি না, তারও কোন নিশচয়তা নেই। এর পরেও ‘মরি-বাঁচি একসাথে’ ঈদ-যাত্রার জোস কারো পরিবারে যেন আবার মৃত্যুর মত দুঃসংবাদ বয়ে না আনে, স্রস্টার কাছে সেই প্রার্থনা করি।

ঈদ এবার যতটাই মলিন হোক, মৃত আত্মাদের কে প্রভু প্রাশান্তি দাও। করোনায় মৃত, আক্রান্ত, ভীত কিংবা সাহায্যকারী-সকলের প্রতি প্রভু রহম কর। এমন দুঃখের ঈদ যেন মানুষের জীবনে এবার ই শেষ হয়, সেই প্রার্থনা করি, প্রভু।

লেখক : মো. নূরুজ্জামান,  নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে


  • 1
    Share
শর্টলিংকঃ