চেতনার বাতিঘরটি নিভে গেল বিকেলে

  • 359
    Shares

আজ বিকেলে জাতীয় অধ্যাপক আমাদের প্রিয় শিক্ষক ড. আনিসুজ্জামান আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন এই করোনাকালে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষক। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমিক স্টাফ ফেলো।

তিনি ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দেশের প্রতিটি সংকটকালে তাঁর বক্তব্য, মন্তব্য এবং ভূমিকা আমাদের জন্য বাতিঘরের কাজ করেছে। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথের গান পাকিস্তানের জাতীয় ভাবাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে বেতার ও টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার হ্রাস করতে আদেশ দেয়। এর প্রতিবাদে আনিসুজ্জামান বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন এবং সেটা বিভিন্ন কাগজে ছাপতে দেন।

ষাটের দশক জুড়ে বাঙালির সংস্কৃতির আন্দোলনের অগ্রগণ্য পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালে গঠিত গণ আদালতের একজন অভিযোগকারী ছিলেন তিনি। তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া মোটেই সহজ কাজ ছিলো না। নিজের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে একাধিক পুরস্কার আর নানা সফলতা পেয়েছেন সকলের প্রিয় এই শিক্ষক। ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

শিক্ষায় অবদানের জন্য তাঁকে ১৯৮৫ সালে ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করা হয়। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তাঁকে ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’ পদক প্রদান করে। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে তাঁকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। ১৯৯৩ ও ২০১৭ সালে দুবার আনন্দবাজার পত্রিকা তাঁকে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করে। ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট ডিগ্রি এবং ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক লাভ করেন।

২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। গত ২৭ এপ্রিল গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় তাকে।

হার্টের সমস্যার পাশাপাশি ৮৩ বছরের এই অধ্যাপক কিডনি, ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের জটিলতায় ভুগছিলেন। ১৯৩৭ সালে কলকাতায় জন্ম নেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। খুলনা জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন।

এক বছর পর পরিবারের সাথে ঢাকায় চলে আসেন এবং প্রিয়নাথ হাইস্কুলে (বর্তমান নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে এ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৫৭ সালে একই বিষয় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

এরপর মাত্র ২২ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালের জুনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারত গমন করে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান বাংলা ভাষায় অনুবাদের যে কমিটি ছিল সেটার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। এছাড়াও ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। সতত প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী মধ্যবিত্ত বাঙালির বাতিঘর ড. আনিসুজ্জামান তোমাকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: আবু আলম মো.শহিদ খান ,সাবেক সচিব


  • 359
    Shares
শর্টলিংকঃ