জামায়াত – শিবিরের আদি-অন্ত (পর্ব-১)

  • 22
    Shares

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে একটি জনযুদ্ধের আদলে গেরিলাযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে।

২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ ও ই.পি.আর.-কে হত্যা করে এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান বাঙালিদের তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। পার্বত্য চট্টগ্ৰামের কালুরঘাট বেতাৱ কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ যুদ্ধ; জীবন বাঁচাতে কয়েক হাজাৱ আওয়ামী লীগেৱ নেতাৱা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে স্বাধীন করতে কয়েক মাসের মধ্যে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী।

গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে গেরিলা বাহিনী সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্য লাভ করে। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন তারা গেরিলা বাহিনীর কাছে পরাজয়ের লজ্জা এড়াবার জন্য এবং স্বাধীনতা যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক সংঘর্ষে পরিণত করার উদ্দেশ্যে ৩ ডিসেম্বর ভারতের বিমান হামলার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

অতঃপর ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি ভাবে জড়িয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ইতোমধ্যে পর্যদুস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তান সামরিক বাহিনী যুদ্ধ বিরতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সৈন্যরা আকস্মিক ভাবে যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে আত্মসমর্পণের দলীল সই করে। এসময় পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ থেকে দলীলে সই করেন নিয়াজি। এরই মাধ্যমে নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের অবসান হয়।

এদিকে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলাম নামের কট্টর মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনটি ছিল বাংলাদেশ জন্মের সূচনা লগ্ন থেকেই স্বাধীনতা বিরোধী। “জামায়াতে ইসলাম বাংলাদেশ” নামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও (বর্তমানে বাংলাদেশ) তাদের অঙ্গসংগঠন ছিল। ধর্মের নামে বাংলাদেশের অশিক্ষিত ও কমশিক্ষিত সাধারণ জনগণের মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে এখানেও নিজেদের খুব শক্ত একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল। যার খেসারত স্বাধীনতা যুদ্ধের কয়েক যুগ পার করে এসেও বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে প্রতিনিয়ত দিতে হচ্ছে।

প্রথমতঃ জামায়াতে ইসলামীর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার কথা কারও অজানা নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের বিরুদ্ধে দলটির কেন্দ্রীয় ও তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সবাই অবস্থান নিয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার পর কাল পরিক্রমায় বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে জামায়াত, শক্ত অবস্থান গড়ে সংসদীয় রাজনীতিতেও।

গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি আস্থাবান যে কোনো নাগরিকই রাজনৈতিক দল গঠন করে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল, যারা বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বেই বিশ্বাস রাখে না এবং দেশটির সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে কাজ করে, তাদের রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিত কি না সে প্রশ্ন তোলাটা এখন অত্যন্ত জরুরি।

প্রথম সভাপতি মীর কাশেম আলী ও সেক্রেটারি কামারুজ্জামানের হাত ধরেই শিবির শুরু করে রগ কাটা তথা খুনের উৎসব। স্বাধীনতার এত বছর পরও জামায়াত একাত্তরের কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এখন জেলে থাকলেও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির এখন সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

কিন্তু ইসলামের নাম ভাঙিয়ে এই জামায়াত শিবির নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে যে ধরনের নৃশংসতা, অধার্মিকতা, কূটকৌশল আর স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী কার্যকলাপ করে চলেছে, তা অনেকেই হয়ত জানেন না। গত প্রায় চার দশক ধরে জামায়াত শিবির ও তাঁদের জঙ্গি সংগঠন সমূহ যে ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে,সেটা কত যে ভয়ঙ্কর আর দুর্বিষহ, তা কল্পনারও অতীত…

ছাত্র শিবির নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন নয়, বরং দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম সক্রিয় একটি সংগঠন। সরকার জামায়াত সম্পর্কে সক্রিয় থাকলেও শিবিরের কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতনতা চোখে পড়ার মতো নয়। তৃণমূল পর্যায়ে শিবির তৈরি করছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।

জামায়াত যদিও দাবি করে থাকে যে, শিবির তাদের অঙ্গসংগঠন নয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা উল্টো কথাই বলে। একটু অতীত ঘাটলেই বেরিয়ে আসে এই সংগঠনটির নানা অপকর্ম, হত্যা, নৃশংসতা আর অপরাজনীতির তথ্যাদি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে জঙ্গি-কার্যক্রম কমেছে বলে দাবি করা হলেও গণমাধ্যমে বারবারই উঠে আসছে নানা তথ্য, যা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, দেশের ভেতরে ও বাইরে বর্তমান সরকার এবং সার্বিক ভাবে বাংলাদেশ বিরোধী যে কর্মকাণ্ড চলছে তাদের নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় এখনও রয়েছে এই সংগঠনটি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন কালে প্রণীত ‘১৯৭২ সালের দালাল আইন’ ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে বাতিল করে দেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। দালাল আইন বাতিলের ফলে জেলে আটক প্রায় সাড়ে ১০ হাজার রাজাকার সে সময় মুক্তি পেয়ে যায়। তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতাবিরোধীদের মুক্ত করে দেয় সাবেক এ সামরিক সরকার। এছাড়া যেসব রাজাকার পাঁচ বছর ধরে পালিয়ে ছিল তারাও তখন বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে আসে।

এই সুযোগে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয় জামায়াত। তাদের পুরনো ‘ছাত্রসংঘ’কে নতুন করে ঢেলে সাজাতে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে রাজধানীর সিদ্দিক বাজারে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয়রা মিলিত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই সংগঠনটির কার্যক্রম প্রায় নিষ্ক্রিয় ছিল। রাজনীতির মাঠে প্রকাশ্যে নামার প্রস্তুতি নেয় ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ নামের দেশবিরোধী সংগঠনটি।

১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ছাত্র সংঘের নতুন নাম হয় ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির’। শুধু ‘সংঘ’ বাদ দিয়ে ‘শিবির’ যুক্ত করা হয়, আর সবকিছুই একই থাকে। পতাকা, মনোগ্রাম সবই এক। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, এমনকি জেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত নেতৃত্ব-কাঠামো সবই এক থাকে। মীর কাশেম আলীকে সভাপতি ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে জামায়াতের এই ছাত্র সংগঠন নতুন কার্যক্রম শুরু করে।

নাম পরিবর্তনের নেপথ্যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের মূলশক্তি ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘের হাতে। কারণ ছাত্র সংঘ মানেই তরুণ রাজাকারদের শক্তি। ১৯৭৬ সালে যখন জামায়াত রাজনীতিতে পুরোদমে প্রবেশ করে তখন জামায়াতের নীতি নির্ধারকদের মনে এই ভয় ছিল যে, ছাত্র সংঘ নামটাকে হয়তো এ দেশের মানুষ একাত্তরে তাদের জঘন্য কর্মকাণ্ডের জন্য ভুলে যাবে না। এই চিন্তা থেকেই তারা ছাত্র সংঘের ‘সংঘ’ কেটে সেখানে ‘শিবির’ যোগ করে দেয়।

দ্বিতীয়তঃ জামায়াত ও ইসলামী ছাত্র সংঘের হিংস্র এবং পৈশাচিক কার্যকলাপ বাংলাদেশের মানুষের মনে একটা স্থায়ী ঘৃণার ভাব সৃষ্টি করেছে। জামায়াত তখন ভালো করেই জানত এই ঘৃণাটা কখনো দূর হবে না। ইসলামী ছাত্র সংঘের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে আলবদর বাহিনীর কথা চলে আসবে। ফলে সংগঠনের প্রচার-প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হবে।

তৃতীয়তঃ যদি কখনো স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে তখন আইনগতভাবে ফেঁসে যেতে পারে ইসলামী ছাত্র সংঘ। সেক্ষেত্রে যাতে সংগঠনের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য জামায়াতের নেতৃবৃন্দ সংঘ নামটি কেটে ফেলে।

আবারও নতুন করে শুরু হয় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী কার্যকলাপ। এক বছরের মধ্যেই শিবির শুরু করে তাদের প্রথম অভিযান। ১৯৭৮ সালে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভেঙ্গে ফেলার জন্য স্বাক্ষর গ্রহণ শুরু করে। এতে সাধারণ ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে রাতের অন্ধকারে তারা অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে।

কিন্তু সচেতন সেই সাধারণ ছাত্রসমাজের প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হঠে এবং সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। এরপর একইভাবে তারা জয়দেবপুরে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। সেখানেও তারা ব্যর্থ হয়। রাজধানী ঢাকায় নানা কার্যক্রমে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের নীতিনির্ধারণী মহল শিবিরকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে।

জামায়াতের কার্যকরী পরিষদের সভায় ১৯৭৮ সালে এই সিদ্ধান্ত হয় যে, ছাত্রসংঘ নাম পাল্টিয়েও যেহেতু শিবিরের কোনো লাভ হয়নি, তাই শিবিরকে ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এই বিষয়টি পরবর্তী সময়ে শিবিরের উত্থানে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে।

একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর হাতে যেসব আলবদর রাজাকার নিহত হয় তাদের নামানুসারে বিভিন্ন সেল গঠন করে তারা তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে শুরু করে। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে তারা একদিকে যেমন অস্ত্র ও অর্থভাণ্ডার গড়ে তোলে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে কোনো স্মৃতি মুছে ফেলার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের দখলদারিত্বের রাজনীতি। এ দেশে আবার নতুন করে শুরু করে আলবদর রাজাকার স্টাইলে তাদের খুনের রাজনীতি।

শুধুমাত্র দেশেই নয় ভিনদেশেও রয়েছে ছাত্রশিবিরের শক্ত অপতৎপরতা। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বেশ কয়েকশ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছাড়ছে। বিশেষ কিছু দেশের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান তাদের কাছে একটু বেশী আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তবে এখনও এ দুটি দেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগের চেয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করতে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। এদের অধিকাংশই স্নাতকোত্তর ও ডক্টরাল প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিতে আসা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উগ্রবাদ প্রচারণায় ব্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা সরাসরি দেশের মৌলিক স্তম্ভগুলোতে আঘাত করে প্রচারণা চালাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল ঘেঁটে ভয়ানক উগ্র-মানসিকতার প্রতিচ্ছবি পাওয়া গিয়েছে। আবার তাঁদেরই আরেকটা বড় অংশ নীরবে সেসব উগ্রবাদীদের সমর্থন মূলক মন্তব্য সহকারে চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বহু নেতা উচ্চশিক্ষার জন্য অবস্থান করে, আর তাদের দায়িত্ব হল – নানা কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের নীরব উত্থান ঘটিয়ে যাওয়া। এই দেশ দুটির বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের মতাদর্শের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম, সেখানে তারা বাকি ছাত্রদের সঙ্গে আপস করে চলে। তবে নিজেদের দল ভারী করার জন্য ধর্মের নানা অনুষঙ্গ ব্যবহার করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ ছাত্রদের কাছে টানাতে অনবরত চেষ্টা করেই যেতে থাকে।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এখন পর্যন্ত জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, কয়েকজনের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড হয়েছে, বিচারাধীন আছে আরও কয়েকজনের এবং জামাতের তৎকালীন অসংখ্য নেতাদের নামে এখনও মামলা করার প্রক্রিয়া জারি আছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিলেও গত কয়েক বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা কৌশল অবলম্বন করেছে জামায়াত ও তার অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির।

নিজেদের অপরাধ লুকাতে বেশ কিছুদিন ধরেই এই জামায়াত সুর বদলিয়ে বলে আসছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘অখণ্ড’ পাকিস্তানের পক্ষে থাকার তাদের সিদ্ধান্তটি ছিল নিছক রাজনৈতিক। এতে তারা কোন অপরাধই করেনি এবং কোন রকমের অপরাধেও তখন তাঁরা জড়ায়নি।

২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা গোলাম আযম নিজে বলেছিল, “১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারা রাজনৈতিক নেতাগণ (জামায়াতের) জনগণকে জুলুম থেকে রক্ষা করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। নির্বাচনে বিজয়ী নেতৃবৃন্দ দেশে না থাকায় সাহায্য প্রার্থী অসহায় জনগণের সমস্যার সমাধান করাই তাদের (জামায়াতের) একমাত্র দায়িত্ব ও চেষ্টা ছিল। আমিও এ চেষ্টাই করেছি মাত্র”।

২০০১ সালে জামায়াত সহ চারদলীয় জোট ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই মৌলবাদী জামায়াত হঠাৎ করেই খুব চতুরতার সাথে আরেক দফা নিজেদের ভোল পাল্টাতে শুরু করে। বিপথগামী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে দলে ভিড়িয়ে জাতীয় দিবসগুলোকে ধর্মীয় প্রলেপ লাগিয়ে আড়ম্বরতার সাথে পালন করার মধ্য দিয়ে সাধারণ জনগণের আরও কাছে পৌঁছে নিজেদের অপকর্মগুলো ঢাকাতে আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করে।

বিভিন্ন ধরনের অপকৌশলের সাথে সাথে ৭৫ সালের সালের পর থেকেই দেশের গ্রাম ও শহরের কোমলমতি বাচ্চাদের থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের আমলাদের পর্যন্ত এরা টার্গেট করে ধর্মের নামে ব্রেইন ওয়াস প্রজেক্টটা চালু করে; একটাই উদ্দেশ্য – নিজেদের নোংরা স্বার্থ হাসিল করা। বর্তমান অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে – ওরা সফলতার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেও গেছে। ওদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে – ৭১-এর খুনি, ধর্ষক, লুটেরা সেই জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদেরকে সকল প্রকার যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে রক্ষা করে দায় মুক্ত করা।

নির্বাচন কমিশনের চাপে সংগঠনটির সংশোধিত বর্তমান সংবিধানটিতে  https://jamaat-e-islami.org/en/pdf/105_constitution_eng_2017.pdf  একটু চোখ বুলালেই খুব সহজ ভাবে বুঝা যাবে, কত সুচতুর ভাবে এরা জনগণের সরলতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে ইসলামিক শাসন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান রাষ্ট্রীয় ভাবে আরও পাকাপোক্ত করতে চায়। অথচ সাংবিধানিক ভাবে বাংলাদেশ একটা সেকুলার রাষ্ট্র। একাত্তুরে বাংলাদেশ নামের একটা সেকুলার স্বাধীন রাষ্ট্র আর সংবিধানের জন্য ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, প্রায় ৩ লক্ষ মা-বোনকে ধর্ষিত হতে হয়েছে এই জামায়াত-শিবির আর তাদের দোসরদের কাছে।

নিজেদের স্বার্থদ্ধারে এরা এতটাই অন্ধ যে, নির্লজ্জের মত জনসম্মুখে দুমুখো হতেও বিন্দু মাত্রও দ্বিধা করে না, যেমন – ইসলামে সাংস্কৃতিক চর্চা হারাম হলেও শিশু কিশোরদের ব্রেইন ওয়াশ করে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য চিত্ত বিনোদনের নামে সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠীসহ শতাধিক শিল্পী গোষ্ঠী পরিচালনা করছে।

সমাজচিন্তক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, চতুরতার মাধ্যমে জামায়াত-শিবির এখন মুক্তিযুদ্ধকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কারণে সচেতন সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা ধীরেধীরে তাদের এই অপকৌশল ধরতে সক্ষম হচ্ছে।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন বুঝতে পারছে, জামায়াত-শিবির তাদের সংগঠনে ভেড়ানোর জন্যই মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও বিভিন্ন সময়ের গণআন্দোলনকে তারা ব্যবহার করছে। এরই মধ্যে গোলাম আযমকেও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক হিসেবে জামায়াত-শিবির দাবি করার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত জামায়াতের এই সাবেক আমীরকে ‘ভাষা সৈনিক’ স্বীকৃতির দাবিও জানিয়েছে। চলবে…

লেখক: সাইদুল ইসলাম, নিউ ইয়র্ক প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


  • 22
    Shares
শর্টলিংকঃ