নাচোলে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে জমি রেজিস্ট্রি

  • 36
    Shares

অলিউল হক ডলার,নাচোল:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মৃত ব্যক্তিসহ প্রবাসী ভাই-বোনের নামে অন্য ব্যক্তিকে দাতা সাজিয়ে জমি রেজিস্ট্রির(সম্পাদনের) অভিযোগ উঠেছে সাব-রেজিস্টার, অফিস সহকারী ও দলিল লেখকদের বিরুদ্ধে।


তথ্য অনুসন্ধানে জানাগেছে, নাচোল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্টার মোছা: মাহমুদ খাতুন, অফিস সহকারী মোজাহারুল ইসলাম, টি.সি মোহরার মজিবুর রহমান, ও নকল নবীশ নজরুল ইসলাম যোগসাজশে ৭টি বন্টননামা দলিলের মোট ২ লাখ, ৬২ হাজার, ৩শ’ ৩০ টাকা উৎসকর বাবদ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দলিলগুলি সম্পাদন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলার ফতেপুর ইউয়িনের উত্তর মল্লিকপুর গ্রামের আব্দুল হান্নান এর ছেলে সোহেল সারোয়ার ।

তিনি জানান, ১৯২৩/২০১৮ নং দলিলে উৎসকর(রাজস্ব) ফাঁকি ৮ হাজার টাকা, ১৯২৪/২০১৮নং দলিলে ৮৬ হাজার ২শ’টাকা, ২০৭৩/২০১৮ নং দলিলে ১৭হাজার ৯শ’৬০, টাকা, ২১৬২/২০১৮নং দলিলে ২২হাজার, টাকা, ২৫০৫/২০১৮নং দলিলে ৩৫ হাজার ১শ’ ৮০টাকা, ২৬০২/২০১৮ নং দলিলে ১৩হাজার ও ৩৪৪৬/২০১৮ নং দলিলে ৭৯ হাজার, ৯শ’ ৯০ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, নাচোল সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সাব রেজিস্টার মাহমুদ খাতুন সম্পাদিত ২০/১২/২০১৮ইং তারিখ জেএল নং ১৪৫ ঘিওন মৌজার আর এস ৯৪ খতিয়ানের প্রস্তাবিত খতিয়ান ৮৬৪এর ১ একর ৮৭ শতাংশ জমির মধ্যে হাল ১৪৩৮ নং দাগের জমি ৪৭৪১ নং থেকে ৪৭৫৯ নম্বর পর্যন্ত মোট ১৯টি দলিল সম্পাদন করেন। দলিল লেখক উপজেলার দক্ষিণ চন্ডিপুর গ্রামের একরামুল হকের ছেলে আব্দুল মালিক, তার সনদ নং-৫২।

ওই দলিলের সাক্ষী উপজেলার নেজামপুর ইউপির জগদইল গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে সামসুল হক ও সনাক্তকারী উপজেলার পাইতালী গ্রামের মৃত আলহাজ্ব বেলাল উদ্দিনের ছেলে গোলাম মোস্তফা। মৃত ব্যক্তির ও বিদেশ প্রবাসী ভাই-বোনের নামে অন্য লোক দিয়ে জমি রেজিস্ট্রির ব্যাপারে সাজিয়ে নোয়াখালীর চাটখিল পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের ফতেপুর গ্রামের মৃত ডাঃ রমজান আলীর ছেলে মৃত হাবিবুর রহমানের মৃত্তান্তে তার ২ স্ত্রী, ৫ পুত্র ও ৮ কন্যা ওই সম্পত্তির ওয়ারিশ হন।

উল্লেখিত ১৯টি দলিলের দাতা ১৪ জন বলে জানাগেছে। নোয়াখালীর চাটখিল পৌর মেয়র দেওয়ান কামাল অহমেদ, সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ার-ই-হাছিনা ও কাউন্সিলর নূর নবীর সাথে যোগাযোগ করলে তাঁরা জানান, দাতা গনের মধ্যে ২নং দাতা মোশাররফ হোসেন(৪৬) প্রায় ২বছর পূবেই মারা গিয়েছেন।

মোশাররফ হোসেনের স্ত্রী বাদে ছেলেমেয়েরা নাবালক। দলিলের ৪নং দাতা জসিম উদ্দিন রাসেদ(৩৫), ৬নং দাতা হাফিজুর রহমান(২৫) ও ৯নং দাতা নারগিস আক্তার(৪৪) ৩ জন অন্তত অনেক বছর যাবত বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তাঁরা নিশ্চিত করেছেন।

অথচ নাচোল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের জালিয়াত চক্র ওই তিনজনের পরিবর্তে ভাড়াটিয়া লোক দাতা সাজিয়ে দলিল সম্পাদন করেছেন। নোয়াখালীর চাটখিল পৌরসভা থেকে ১০/০২/২০১৮ তারিখে চাঃ পৌঃ /(সাধাঃ)/২০১৮/১১৪/১ স্মারকের ওয়ারিশান সনদপত্রে মৃত হাবিবুর রহমানের ১ম স্ত্রী মৃত মরিয়ম বেগমের বয়স লেখা রয়েছে ৬০ বছর। তার কন্যা সালেহ বেগমের বয়স লেখা রয়েছে ৫০বছর।

মাত্র ১০বছর বয়সে মৃত হাবিবুর রহমানের সাথে ১ম স্ত্রী মরিয়ম বেগমের বিয়ে হয়েছিলো এমনটিই প্রতীয়মান হয়। তাই ওই ওয়ারিশান সনদটিতেও সন্দেহ আছে। এছাড়া গত ০১/০৭/২০১৯ ই তারিখে ২১৪৩/২০১৯ নং হেবার ঘোষণা দলিলে দাতা হাবিবুর রহমান তার সন্তানদের কাছে ৪২০নং আরএস দাগের জমির রেকর্ডয় খতিয়ান বা দলিল কাগজপত্র ছাড়াই সাব-রেস্টিারের অফিসের যোগসাজশে ২১৪৩/২০১৯ নং দলিলটি সম্পাদন হয়েছে বলে ওই জমিতে দীর্ঘ ২৫বছর যাবত বসবাসকারী শিবপুর গ্রামের শাহজাহান আলী অভিযোগে জানিয়েছেন।

তিনি নাচোল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্টার মাহমুদ খাতুন অফিস সহকারী মোজাহারুল ইসলাম, টি.সি মোহরার মজিবুর রহমান, ও নকল নবীশ নজরুল ইসলাম যোগসাজশে ৭টি বন্টননামা দলিলের মোট ২ লাখ, ৬২ হাজার, ৩শ’ ৩০ টাকা উৎসকর বাবদ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দলিলগুলি সম্পাদন করেছেন বলে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছেন।

এদিকে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সিন্ডিকেট সদস্যরা দীর্ঘদিন থেকে নিরীহ দাতা-গ্রহীতাদের নিকট থেকে অলিখিত আইন করে প্রতিটি খোস-কবলা, হেবার ঘোষণা, দানপত্র দলিলে খারিজ থাকলে ১ হাজার, খারিজ না থাকলে ১ হাজর ৭শ’ টাকা হারে আদায় করে চলেছে।

উল্লেখিত ৭টি দলিলের বিপরীতে ২ লাখ, ৬২ হাজার, ৩শ’ ৩০ টাকা উৎসকর(রাজস্ব) ফাঁকি ও ২০/১২/২০১৮ তারিখে সম্পাদিত দলিলের ৪জন ভুয়া দাতাকে দিয়ে ১৯টি দলিল সম্পাদনের বিষয়ে সাব রেজিস্টার মাহমুদা খাতুনের সাথে অফিসে তাঁর মতামত জানতে চাইলে তিনি ভুয়া(প্রক্সি)দাতা সম্পর্কে জানেন না বলে জানান। এটি একমাত্র দাতা-গ্রহীতা, সাক্ষী ও সনাক্তকারীরাই ভালো জানেন। ৭টি দলিলের বিপরীতে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে দলিল লেখককে রাজস্ব’র টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে।

এব্যাপারে, ৪জন ভুয়া দাতাকে দিয়ে ১৯টি দলিলের সাক্ষী সামসুল হক ও সনাক্তকারী গোলাম মোস্তফার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন রিসিভ করেননি। তবে দলিল লেখক উপজেলার দক্ষিণ চন্ডিপুর গ্রামের একরামুল হকের ছেলে আব্দুল মালেক এ ব্যাপারে জানান; জমির দাতা, গ্রহীতা, সাক্ষী ও সনাক্তকারীদের কথা মতো আমি লিখেছি।

দীর্ঘদিন থেকে নাচোল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সন্নিকটে মসজিদের নামে রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিল প্রতি ৫০ টাকা আদায় করা হলেও মসজিদের ইমাম সাহেবের বেতন পরিশোধ করতে প্রতিমাসেই গড়িমসি করেন অফিস সহকারী এমন অভিযোগ করেছেন নাচোল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখকগণ। এবিষয়ে জেলা রেজিস্টার আকবর হোসেন জানান, এ সংক্রান্ত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।


  • 36
    Shares
শর্টলিংকঃ