প্রিয়ার নালিশ : ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং ফ্যাক্ট

  • 85
    Shares


প্রিয়া সাহার নালিশ কান্ডটি সবাই কমবেশি জানেন তাই নতুন করে বলবার কিছু নেই তবে এই  কান্ডের কিছু ষড়যন্ত্র ত্বত্ত আর ফ্যাক্ট নিয়ে আলোচনা করবো আজকের এই লেখায়। মাইনরিটি বা সংখ্যালঘু শুধু বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বে নির্যাতিত নিপীড়িত।সে যে ধরনের মাইনরিটিই হোক না কেন,তারা হতে পারে রিলিজিয়াস মাইনরিটি(ধর্মীয় সংখ্যালঘু) অথবা ইন্ডিজিনিয়াস মাইনরিটি(আদিবাসী সংখ্যালঘু) অথবা জেন্ডার মাইনরিটি(লৈঙ্গিক সংখ্যালঘু অর্থাৎ তৃতীয় লিঙ্গ) অথবা পলিটিকাল মাইনরিটি(রাজনৈতিক সংখ্যালঘু)।

মাইনরিটি বা সংখ্যালঘুর অনেক শ্রেনীবিভাগ  হতে পারে তবে আমরা সাধারণত সংখ্যালঘু বলতে হিন্দু এবং আদিবাসীদেরই বুঝে থাকি।আমাদের ভুখন্ডের হিসেবে অবশ্য তাদেরকেই সংখ্যালঘু হিসেবে আমরা চিনে এসছি তবে সংজ্ঞার এই নির্ধারন নিশ্চয় হিন্দু প্রধান কিংবা খ্রিস্টান প্রধান রাষ্ট্র গুলোতে ভিন্ন ভিন্ন।সংখ্যালঘুদের উপর অমানবিক পীড়ন দেশে দেশে কালে কালে সভ্যতার আদি থেকে আজ অব্দি চলে আসছে। এ নতুন কোন ঘটনা নয়।সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে জন্ম নেয়া হিন্দুস্থানে মুসলমানদের উপর আর পাকস্থানে হিন্দুদের উপর  কি নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে তা আমরা সবাই ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালেই দেখতে পাবো।

আমাদের দেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন সভ্য এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিভিন্ন সংখ্যালঘু  সম্প্রদায়গুলোর উপর এমন নির্যাতন এখনো যে অব্যহত আছে একথা অস্বীকার করার কিছু নেই।প্রিয়া  সাহা যে মার্কিন মুলুকের সাহায্য চেয়েছেন সেখানেও আমরা দেখেছি কালার মাইনরিটির তথা কালো  মানুষদের উপর সাদা চামড়ার মানুষদের বর্ণবাদী আস্ফালন,শুধু তাই নয় জেন্ডার মাইনরিটির উপর  নির্যাতনের বহু ঘটনাও তথাকথিত সভ্যতা আর গণতন্ত্রের তল্পিবাহক মার্কিন মুলুকে আমরা দেখেছি।

যে ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন সাম্প্রদায়িক খ্রিষ্টান এবং বর্ণবাদী শিষ্ঠাচার জ্ঞানশূন্য একজন  রাজনীতিবিদ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত তার কাছে প্রিয়া সাহা কিভাবে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আশা করেন তা আমি সত্যিই বুঝে উঠতে পারছিনা।এইতো গত সপ্তাহের মঙ্গলবারের ঘটনা,ট্রাম্প  বর্ণবাদী মন্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাস করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিুকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ।

হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এর চারজন নারী ডেমোক্রেট পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রতি ইঙ্গিত করে দেয়া ট্রাম্পের বর্ণবাদী বক্তব্যের জন্য ইতিহাসে চতুর্থবারের মত মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমন নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।জানা গেছে একজন মুসলিম সহ আদিবাসী ওই চার নারী  ডেমোক্রেট পার্লামেন্ট সদস্যদের নিজ দেশে ফেরত যাবার কথা বলেছেন ট্রাম্প সাহেব,খোদ মার্কিনিরা  সহ বিশ্ব নেতারা এ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

সংখ্যালঘুদের প্রতি এমন বিরুপ মনোভাব  পোষণকারীর কাছে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আশা করা কতখানি যৌক্তিক তা ভাববার বিষয়  বটে।এরচেয়ে প্রিয়া সাহা যদি পাশের হিন্দু প্রধান দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা  করতেন তবে সেটি বেশী যৌক্তিক বলে মনে হতো যদিও সে ক্ষেত্রেও দেশের সুনাম সমান ভাবেই  ক্ষুণè করা হত যেমনটা এক্ষেত্রে হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে নালিশ এবং মার্কিন মুলুকের  সাহায্য প্রার্থনা আমাদের একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহলের ষড়যন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়,যা কখনোই আমাদের দেশের জন্য সুখকর এবং সম্মানের নয়।সেই রাজনৈতিক মহল অর্থাৎ বিএনপি  জামাত জোটের ষড়যন্ত্র হতে পারে এটি বলে অনেকে মনে করলেও আমার কাছে সার্বিক বিবেচনায়  তা যৌক্তিক বলে মনে হয়না তাই সে ষড়যন্ত্র ত্বত্তের ফ্যাক্ট আপাতত বাদ থাক।

প্রিয়া সাহা গতকালের ইউটিউব ভিডিওতে বলেছেন “আমি ভালো নেই,আমি এবং আমার পরিবার  হুমকির মুখে”এবং ট্রাম্পের কাছেও অভিযোগ করেছেন তার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং জমি  দখলের।

যদিও এসকল বক্তব্য পলিটিকাল কিংবা মাইনরিটি এস্যাইলাম এর দিকেই নির্দেশ করে  তবুও আমার কাছে মনে হয় ঘটনার আরো গভীরতা আছে।প্রিয়া সাহার এই নালিশ কান্ড সাধারণ  মানুষ নিছক পলিটিকাল এস্যাইলাম খোঁজার ছুঁত হিসেবে দেখলেও আমার কাছে মনে হয় এর পেছনে  নিশ্চয় কোন গোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে।

বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরে মার্কিন নৌঘাটি  স্থাপন নিয়ে বর্তমান সরকারের সাথে মার্কিনী সরকারের স¤পর্কের অবনতির কথা আমরা কমবেশি  সবাই জানি।

দেশের সমুদ্র বন্দরে মার্কিন নৌঘাটি স্থাপন করতে না দেবার সিদ্ধান্ত সরকারের সাহস  দৃড়তা আর দেশ প্রেমের এক অনবদ্য উদাহরণ বলে আমি মনে করি।এছাড়াও বিভিন্ন সময় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিনীদের নাক গলানোর কঠোর সমালোচনা করে থাকেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী সহ বিভিন্ন মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক নেতারা।এসব ইস্যুকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র  চালিয়ে আসছে মার্কিন প্রশাসন।

কখনো জঙ্গিবাদের ভেলকি দেখিয়ে কখনো বা পদ্মাসেতুতে আগাম দূর্নীতি হবার পূর্বাভাস নিয়ে কখনো বা ভোটে গণতন্ত্র রক্ষার নামে বারবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ  বিষয়ে নাক গলাবার চেষ্টা করে চলেছে তারা।কাজেই এই সরকারকে একটি বিব্রতকর অবস্থায়  ফেলতে প্রিয়া সাহা কান্ড যে মার্কিনীদেরই তৈরী এই সম্ভবনা একেবারেই উঠিয়ে দেবার নয়।

পত্র  পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও  প্রিয়া সাহা সাংগঠনিক ভাবে উক্ত সফরে যাননি এমনকি তার ্ট্রাম্পের  সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি  মিডিয়ায় আসার আগে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা জানতেনই না।এখানে বড় প্রশ্ন হল  প্রিয়া সাহা কিভাবে সরাসরি ট্রাম্প এর কাছে পৌছালো?

প্রিয়া সাহা নিজের বক্তব্য নিয়ে  ইউটিউবে অজ্ঞাত কারো কাছে এক সাক্ষাৎকার দেন যাতে তিনি দাবি করেছেন সংগঠনের প্রতিনিধি  হিসেবে নয় বরং মার্কিন এমব্যাসির সরাসরি আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে যান তিনি।এতে তার সাথে  মার্কিন প্রশাসনের সখ্যতার বিষয়টি মোটামোটি স্পষ্ট

১৭ টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে একান্ত  সাক্ষাতের সময় ট্রা¤পকে নালিশ করেন প্রিয়া সাহা এখন প্রশ্ন হল একান্ত সাক্ষাতের সময়ের ভিডিও ফুটেজটি মার্কিন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ালো কিভাবে?।একমাত্র উদ্দেশ্য প্রনদিত হলেই এমনটা হওয়া সম্ভব।এই প্রতিনিধি সভায় বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৭ জন প্রতিনিধি উপস্থিত থাকলেও শুধুমাত্র প্রিয়া সাহার বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার মানে হল এই কেউ চাই যে বিষয়টি ছড়িয়ে যাক।

বাংলাদেশ এবং বর্তমান সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে প্রিয়া সাহাকে ব্যবহার করে মার্কিনীরাই যে এ ঘটনার জন্ম দিয়েছে,সে সম্ভবনা একেবারেই যে নেই তা কিন্তু নয়।নিকট অতিতে বাংলাদেশীদের ব্যবহার করে নিজেদের ফাইদা হাসিল করবার মার্কিনী ব্যার্থ চেষ্টা আমরা একাধিকবার দেখেছি।এ গেল একটি সম্ভব্য দিক আরেকটি দিকও আছে এবার সেদিকে  আপনাদের দৃষ্টিপাত করাতে চাই।

৪৭ এর সাম্প্রদায়িক বিষফোঁড়ার সবচেয়ে বড় অংশটি আজো কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের পাশের বন্ধু রাষ্ট্র ভারত।দেশ ভাগের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধর্মীয় সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘুদের সংঘাত অর্থাৎ হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা চলছেই। “জয় শ্রী রাম” না বলাই  কিংবা গরুর মাংস খাবার অপরাধে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর সাম্প্রদায়িক হিন্দু মহলের  নির্যাতনের ঘটনা আজকাল অহরহ ঘটেই চলেছে।

দ্বিতীয় দফায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার  গঠন করা মোদি আর তার সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি ক্ষমতায় আসীন হবার পর থেকে এসকল ঘটনার ধারাবাহিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে।নিজেদের এলিবাই তৈরীর জন্য ভারত প্রিয়া সাহাকে দিয়ে এমন বক্তব্য দেওয়াতেই পারে।এতে ভারত বিশ্ব দরবারে বলতে পারবে না শুধু আমার দেশে নয় পাশের দেশ বাংলাদেশেও ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।

এবার দেখা যাক আরেকটি সম্ভব্য দিক,সম্প্রতি সময়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইরান বিরোধী সামরিক জোট গঠনের খবরটি নিশ্চয় আমরা সবাই জানি।সন্ত্রাস জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বললেও মূলত ইরানের বিরুদ্ধে গঠিত সামরিক এই জোটে বাংলাদেশী সেনাবাহিনীকে পাশে চায় সৌদি আরব।

যদিও পর্দার আড়ালে সেই মার্কিন মুলুক তবুও এই ইস্যুতে কিছুটা হলেও বাংলাদেশের উপর মনক্ষুণè আরব কারণ প্রথমে শুধুমাত্র তথ্য ও গবেষণা বিষয়ে সহায়তার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে কেবলমাত্র মক্কা-মদিনা আক্রান্ত হলে সেনা পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

যাতে কিছুটা হলেও সরকারের উপর ক্ষুব্ধ সৌদি প্রশাসন।কাজেই সরকারকে বিব্রত করতে বা সরকারের সুনাম ক্ষুণè করতে সৌদি চক্রান্ত হলেও হতে পারে এটি।বিএনপি জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় থাকলে যে তাদের কাম্য সেনা সমর্থন তারা পেত এমন ধারণ তাদের বদ্ধমূল।তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি সৌদিআরবের নেতৃত্বে সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সরকারের এই সিদ্ধান্ত সংবিধানের পরিপন্থী।

আলোচিত সম্ভব্য ঘটনা গুলো ঘটলেও ঘটতে পারে কারণ প্রতিটি ইস্যুই কিন্তু ফ্যাক্ট। প্রিয়া সাহা যে কাউরো হিন স্বার্থ চরিতার্থ করবার উদ্দেশ্যে এই নালিশ কান্ডটি ঘটিয়েছেন তা মোটামোটি নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় এখন সেটি কার নিজের নাকি অন্য কোন সম্ভব্য পক্ষের তা বের করবার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।প্রিয়া সাহার নালিশ কান্ডকে নিছক হেয়ালিপনা না ভেবে ভালোমত খতিয়ে দেখা উচিৎ সরকারের কারণ এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর ষড়যন্ত্র।

লেখকঃ তামিম শিরাজী।
সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।


  • 85
    Shares
শর্টলিংকঃ