‘আমি মরে গেলেই এ শিল্প শেষ’

  • 31
    Shares

মাহফুজ রুবেল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ফিরে :

আমি যতদিন বেঁচে আছি তত দিনই ভেঁড়ার লোমের কম্বল থাকবে, তারপর হারিয়ে যাবে।সৌখিন মানুষের পছন্দের শীতবস্ত্র কম্বল। আর এ কম্বলপ্রিয় মানুষদের একটা অংশের কাছে বেশ জনপ্রিয় ভেড়ার লোম দিয়ে বানানো কম্বল। এ কম্বল হরহামেশা পাওয়া যায় না। হাতেই তৈরী এ কম্বল প্রায় দুস্প্রাপ্য।

রাজশাহী অঞ্চলে এক সময় বেশ কিছু জায়গায় এমন কম্বল তৈরী হলেও এখন সেগুলো বন্ধ হয়েগেছে। তবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভেড়ার লোম থেকে কম্বল তৈরীর এ কারবার এখনো অব্যাহত রেখেছেন আব্দুল খালেক। আব্দুল খালেকের আশেপাশে কেউ নেই, এটাই তার দুশ্চিন্তা। তিনি যখন থাকবেন না তখন এই শিল্প কি হারিয়েই যাবে। নিজের বিকল্প তৈরী না হওয়ায় খালেকের এমন প্রশ্ন। এ ভেবে তিনি বললেন, ‘‘আমার বিকল্প তৈরী হলো না, তার মানে আমি মরে গেলেই এ শিল্প শেষ।”

বইপুস্তক ঘেঁটে দেখা যায়, প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতায় পশুর লোমের ব্যবহার ছিল। অনেক সৌখিন বস্ত্র তৈরী হতো লোম দিয়েই। বাংলাদেশ ভূখন্ডে ভেড়ার লোমকেন্দ্রিক বস্ত্রের বেশ কদর দেখা যায়। প্রধানত গারলী সপ্রদায়ের মানুষ এ কাজের সাথে যুক্ত ছিল বলে জানা যায়। বাংলাদেশের কিছু কিছু অঞ্চলে এ সপ্রদায়ের মানুষ বাস করতো এবং তারাই প্রধানত ভেড়ার লোম সংগ্রহ করে তা থেকে সুতা তৈরি করে প্রাচীন তাঁতযন্ত্র ব্যবহার করে কম্বল জাতীয় মোটা বস্ত্র তৈরি করতো।

১৯২৯ সালে বঙ্গীয় শিল্প বিভাগের প্রতিবেদনে রাজশাহী, নোয়াখালী, নদীয়া এবং বর্ধমান জেলায় এ কাজের প্রচলন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে, রাজশাহী মহানগরীর কেশবপুর-ভেড়ীপাড়ায় অন্তত বারো-পনেরোটি পরিবার এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে ১৯২৯ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন রাজশাহী শহরের ভেড়ীপাড়ায় ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল বানানোর কারিগরদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে, ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভেড়ার লোম থেকে কম্বল তৈরীর ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া গেলো। চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিডিআর ক্যাম্প আর হর্টিকালচার সেন্টার পেরিয়ে মহানন্দা নদী তীরের নয়াগোলা নামক ছোট্ট গ্রামটিতে গিয়ে দেখা মিললো এ শিল্পের।সেখানকারই একটি বাড়িতে প্রায় ১০০ বছর ধরে এ ধরনের কম্বল তৈরী হয়ে আসছে। এখন এ শিল্পের একমাত্র কারিগর আব্দুল খালেক। তার বাবা ফজলুর রহমান ভারতে থাকাকালে এ শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন।


মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের বরোজ গ্রামের ‘গারলী’ সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে তিনি এ কাজ করতেন। তাদের কাছেই তিনি ভেড়ার লোমের কম্বল তৈরি করার কাজটি রপ্ত করেন। ১৯৪৭ এর কিছুদিন পর ফজলুর রহমান চলে আসেন বাংলাদেশে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয়াগোলা গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। এখানেই তিনি কম্বল তৈরীর কাজটি করতেন। ফজলুর রহমানের ছেলে আব্দুল খালেক ছিলেন তার অন্যতম সহযোগি। বাবার সাথে এই নিপুণ কাজটি করতে করতে এক সময় তিন এটিকেই বেছে নেন পেশা হিসেবে। একসময় বাবা মারা গেলেন। তার পরও ঐতিহ্য ধরে রাখলেন আব্দুল খালেক। তার সংসারও চলে এ কম্বল তৈরী করেই। আব্দুল খালেকের মনে আফসোসের অন্ত নেই। সেটা হলো তার এ কম্বল তৈরীর কারবারে কাউকেই সহযোগি হিসেবে না পাওয়ার আফসোস। তিনি নিজে তার বাবার সহযোগি থাকলেও নিজে তার কোন ছেলেকে তো সঙ্গে পানই নি আশপাশের কাউকেই এ পেশায় জড়াতে পারেন নি। ভেড়ার লোম নিয়ে কাজ করতে এখন আর কেউ আগ্রহ দেখান না।

আব্দুল খালেকের দুই ছেলে বড় হয়েছে। নিজেদের পছন্দের পেশায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন তারা নিজেরাই। আব্দুল খালেক এখন বয়সের কারণে তেমন একটা পরিশ্রম করতে পারেন না। কোনমতে কষ্ট করে কম্বল তৈরীর এ কাজটিই করে যাচ্ছেন।আব্দুল খালেক বলেন, ভেড়ার গায়ের ৭ রকম রঙ হয়ে থাকে। নানান রঙের লোম সংগ্রহের পর সেগুলো পরিস্কার করে সুতা বানানো হয়। এরপর সেই সুতা দিয়েই বানানো হয় নান্দনিক দৃশ্যের কারুকাজযুক্ত লোমের কম্বল। প্রতি পিস কম্বল বানাতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৬টি ভেড়ার লোম। একটি বানাতে তার ৬ দিন সময় লাগে। কম্বল বানানোর জন্য নিজেই বাড়িতে একটি ছোট্ট তাঁত বসিয়েছেন তিনি। প্রথমে লোম থেকে সুক্ষ সুক্ষ সুতা বের করে সেগুলো জড়ান চরকায়। এরপর সেখানেই বানান কম্বল। বানানো কম্বল দেখে বোঝার উপায় নেই এটি হাতের তৈরী কিংবা ঘরোয়াভাবে বানানো। কম্বলের উপরে বিভিন্ন ডিজাইনও দেন। কম্বল বানানোর পর সেগুলো বিক্রির জন্য তাকে কোথাও নিয়ে যেতে হয়না । বরং ক্রেতারাই ছুটে যান তার বাড়িতে। সেখান থেকেই বিক্রি হয়ে যায়।

অনেকেই যেমন নিজে ব্যবহার করার জন্য কম্বল কিনেন, আবার অনেকেই সেগুলো পাইকারিভাবে কিনে নিয়ে যান। পরে তা বিক্রি করেন নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়িরা এখান থেকে কম্বল সংগ্রহ করে থাকেন। কেউ কেউ আবার এই কম্বল পাঠান বিদেশেও। আব্দুল খালেক বললেন, স্থানীয়ভাবে যারা কেনেন তাদের কাছে তিনি প্রতিটি কম্বলের দাম রাখেন ২ হাজার টাকা করে। তবে, বিদেশে পাঠানোর জন্য যারা আগাম অর্ডার দেন তাদের জন্য বাড়তি সময় আর পরিশ্রম দিয়ে তুলনামুলক বাড়তি মানের কম্বল বানিয়ে থাকেন। আবার কারো কারো চাহিদামত ডিজাইনও করে দেন তিনি। এসব কম্বলের দাম নেন ৩ হাজার টাকা করে। তিনি প্রতি বছর একশ থেকে দেড়শ কম্বল বানান। তবে আগের মত আর কাজ করতে পারেন না। মুলত শরীরটা তাকে বেশি কাজ করার সুযোগ দেয় না।এছাড়া পুরো কাজটাই তাকে একা করতে হয় বলে পরিশ্রমটাও একটু বেশি হয়।
খালেক বলেন, আমি এটি আমার বাবার কাছে শিখেছি। আমার বাবা আমার দাদার কাছে শিখেছিলেন। তবে বর্তমানে আমার পরিবারের কেউই এটিতে আগ্রহী নয়। এ কম্বলের আয় দিয়েই আমার সংসার চলছে। দুই ছেলেকে মানুষ করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তারা এ কাজ শিখতে চায় না। বাবা দাদার এ শিল্পের হয়তো এখানেই ইতি টানতে হবে।

সম্ভাবনার কথা শোনালেন আব্দুল খালেক। তিনি বললেন, বর্তমানে এ এলাকায় ভেড়ার চাষ বাড়ছে। সেই সাথে খামারে হচ্ছে গাড়লের চাষ। এটিকে কাজে লাগানোর যথেষ্ট সুযোগ আছে। একটু পরিকল্পিতভাবে এখান থেকে লোম সংগ্রহ করে সেগুলো থেকে ভালোমানের কম্বল তৈরী করা সম্ভব। এজন্য দরকার উদ্যোগ। কিছু মানুষকে এবিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। এক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা ও উদ্যোগ প্রয়োজন।

আব্দুল খালেক বলেন, এখানে যেসব ভেড়া বা গাড়ল রয়েছে সেগুলোর লোম কাটারই লোক নেই এ এলাকায়। তিনি এখন সেগুলোর লোম কেটে দিয়ে আসেন। এখান থেকে ভালো জাতের লোম নেন। বাকিগুলো ফেলে দেন। প্রতিটি ভেড়ার লোম কাটতে তিনি ৫০ টাকা করে নেন। আব্দুল খালেকের কম্বল তৈরীর খবর পেয়ে বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী, সচিবরা তার কাছে গেছেন। দিয়েছেন বিভিন্ন আশ্বাসও। তবে, পরে আর এ বিষয়টা তেমন এগোয় নি। অথচ বেশ পুরনো এ শিল্প নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। সরকারের উচিত আমার কাছে থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বেকার ছেলেমেয়েদের আয়ের পথ খুলে দেয়া। এটির মাধ্যমে বেশ ভালো আয়ের সুযোগ আছে বিদেশেও।

অরণ্য ক্যাফটস লিমিটেডের প্রসিউরমেন্ট এক্সিকিউটিভ মারুফ হাসান বলেন, আমরা তার কাছে থেকে কম্বল সংগ্রহ করি। এগুলো আমাদের শ্লো আইটেম। এগুলো বছরে ১০ থেকে ১২টির অর্ডার করা হয়। আমরা এগুলো তার কাছে থেকে এনে গ্রাহককে দেই। এগুলোর মান অনেক ভালো। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি বিদেশেও বেশ নাম কুড়াবে। পাশাপাশি এগুলো রফতানী করে আয়ও সম্ভব বলে জানান তিনি।


  • 31
    Shares
শর্টলিংকঃ