রাবি ক্যাম্পাসে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা

  • 1.5K
    Shares

সুব্রত গাইন, রাবি: 
দুই অক্ষরের সম্বন্বয়ে ফুৎকার বাদ্যযন্ত্র। এই ফুৎকার যন্ত্রটি একই সাথে প্রেম, প্রলয়, জীবন, মৃত্যু, সুখ ও বিরহের প্রতীক। শব্দে নর-নারীর হৃদয়ে যেমন প্রেম-বিরহের ঝড় উঠে তেমনি প্রকৃতি প্রেমী মানুষ হারিয়ে যায় প্রকৃতির মাঝে। কারো কাছে প্রেম-ভালবাসার প্রতীক আবার কারো কাছে ভীতির। তবুও বড় প্রিয় ও আদরের বস্তু। রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, চোর-সাধু এক কথায় সবার প্রিয়। দেখলেই মনের অজান্তে একটা সুর তুলতে ইচ্ছা করে। এটা আর কিছু নয় দুই অক্ষরের বাঁশি।

মনে পড়ে যায় অতনু নন্দীর ‘রাখালিয়া বাশি’ কবিতার দুইটা লাইনের কথা – কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে ? হৃদি মোর উঠল কাঁপি’ চরণের সেই রণনে। তবে কে এই বাঁশির উদ্ভাবক সে সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণা নেই। জানি না সেই কবে কোন ইতিহাসের অন্ধকার যুগে প্রথম বাঁশি বেজেছিল। তারপর মহাকালের পথ ধরে কত জানা-অজানা, জীর্ণ কুটিরে, রাজপথে, মেঠোপথে, সুুুরের জলসায়, মাঠে-ঘাটে, মেলা, পালা-পার্বণে, মানুষের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহে সেই বাঁশি আজও বেজে চলেছে।

বাঁশির প্রসঙ্গে আসলেই মনের বড় পর্দায় ভেসে আসে তিনটা নাম। রাখাল রাজ শ্রীকৃষ্ণ, হ্যামিলনের বংশীবাদক ও গ্রিসের অবফিউস। এদের বাঁশির সুর-মাধুর্য এতো আকর্ষণীয় এবং চিত্তাকর্ষক যে, চারদেয়ালে বন্দি মুগ্ধ স্রোতাকে আটকে রাখতে পারে না।

মহাভারতে উল্লেখ আছে যে কৃষ্ণের বাঁশির সুরে রাধা পাগলের মতো হয়ে যেতো। এমনকি ঘরে যমুনার জল আনা থাকলেও তা ফেলে দিয়ে জল আনতে যেতো। তেমনি হ্যামিলনের বংশিবাদক শহরের সব ইঁদুর তার অপূর্ব মোহনীয় বাঁশির সুরে রাস্তায় নিয়ে এসেছিল এবং নদীতে ফেলে মেরে ফেলেছিল। আরেকজন বংশিবাদক হলেন অরফিউস। তার বাঁশির সুরে প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে যেতো, নদীর স্রোত থেমে যেতো।

তেমনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেলে এক সুরের ফেরিওয়ালাকে। পৃথিবীর সব সুর যেন সেই বাঁশির ভিতরে আত্মগোপন করেছে। এই বংশীবাদককে যে দেখবে সে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সাথে গুলিয়ে ফেলবে। সেটা কল্পনায় বা বাস্তবে। মনে পরে যাবে সেই ছোটো বেলার গল্প পড়ার কথা। বইতে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাকে যেমন দেখা গেছে তাকে দেখেও ঠিক চোখ আটকে যাবে। কত বিচিত্র তার পোশাক। হাতে বাশি, মাথায় গেরুয়া রঙের টুপি, লাল শার্ট, কালো প্যান্ট আর সাথে আছে এক থলে বাঁশি। বাঁশি বাজায় আর হাটে, মাঝে মাঝে একটু বসে কারো সাথে খোঁশ গল্প-গুজব করে। আবার বাঁশি বাজায়। যেন গল্প কাহিনীর সেই হ্যামিলন ফিরে এসেছে।

ওই সময় একটু গল্প করার সুযোগ হলো। গল্প করার ফাঁকে একসময় বলে উঠলেন বাঁশিতে শুধু ফু দিলেই বাজে না। বাঁশি বাজানো শিখতে হলে, আগে নিজে বাঁশি হতে হবে। তারপর বাঁশির সুর উঠবে। তাই বাঁশি বাজানো শিখতে হলে আগে মন ও প্রাণ এর ভিতরে সংযোজন করতে হবে। পড়ালেখা করতে হলে যেমন অক্ষরের সাথে বিলিন হতে হয় তেমনি বাঁশি বাজানোর ক্ষেত্রে। তাই বাঁশি বাজানো শিখতে হলে এর সাথে প্রেম করতে হবে।

বাঁশির সাথে প্রেমের কারণে আজও এটাকে ছাড়তে পারেনি বলে জানান ক্যাম্পাসের সেই বংশীবাদক গনেশ দাস। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে এখনও বাঁশির সাথে আছেন। তিনি জানান, ১৯৬৬ সাল থেকে বাঁশি বানিয়ে বিক্রি করে আসছেন। পারিবারিক ব্যবসা আর বাঁশি বাজানোর নেশায় আজও এর পিছন ছাড়তে পারেননি তিনি। ছোট বেলা থেকেই এর দিকে ছিল অনেক ঝোঁক। সেই সময় থেকেই বাঁশি বাজানো আর জীবিকার তাগিদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা যাওয়া। সেই মায়া এখনও কাটেনি।

ক্যাম্পাসের মায়ার টানে আজ সে ক্যাম্পাসে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। গনেশ দাস মনে করেন, বাঁশির মধ্যে আর একটা মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তার ভাষায় বাঁশিও একটা মানুষ। বাঁশির যেমন নয়টা ঘাট, দুইটা বন্দ, অনন্দ ছিদ্র আছে তেমনি মানুষেরও আছে। মানুষের সাথে কথা বললে মানুষ যেমন শুনে তেমনি বাঁশিও।

অনেকভাবে বাঁশি তৈরি করা যায়। প্রায় ২২ ধরণের বাঁশি আছে। এক একটা বাঁশির দামও তেমনি আলাদা। বিশ টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে চার‘শ টাকা পর্যন্ত আছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আধুনিক যন্ত্রপাতির ফলে আজকাল কেউ বাঁশি বাজাতে চায় না। এমনকি শেখার আগ্রহ নিয়েও আসে না। আগের দিনের সেই ঐতিহ্য আর নেই। ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র অন্য সব কিছুকে গ্রাস করে ফেলেছে। তারপরও আমি বাঁশি ছাড়তে পারছি না।’

অভাবের সংসারে শুধুমাত্র বাঁশি বিক্রি করে কোনো রকম দিন কাটে তার। এর মধ্যেই স্ত্রী‘র ব্লাড ক্যান্সারে সংসারের অবস্থা আরো নাজেহাল। একদিকে স্ত্রী‘র চিকিৎসার খরচ অন্যদিকে সংসার আর ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা। শেষে না হলে স্ত্রীর চিকিৎসা না হলো সন্তানদের পড়ালেখা।

তবুও ডাক্তার দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করার পরও চিরদিনের মতো স্ত্রী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এভাবে চলতে থাকে সেই বংশীবাদক শ্রী গনেশ চন্দ্র দাসের জীবন। কোনো রকমভাবে ছোট ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বুড়ো বয়সের এখন একমাত্র সম্বল বাঁশি। যা বিক্রি করেই জীবন চলছে তার।

কিন্তু সেই বাঁশি তৈরি করতে যে বাঁশ দরকার তা সংগ্রহ করাও হয়েছে কষ্ট্যসাধ্য। চট্টগ্রাম আর ঢাকা থেকে অনেক টাকা দিয়ে কিনে আনতে হয় বাঁশ। টাকার অভাবে যে পরিমান বাঁশ দরকার তাও আনতে পারছে না তিনি। তারপর সেগুলোকে বাঁশি তৈরি করে তুলতে হয় অনেক পরিশ্রম। আবার যে বাঁশিগুলো তৈরি করছে তা পাইকারী দামে বিক্রি করতে গেলে নিজের কিছুই থাকছে না।

খুচরা করে বিক্রি করলে নিজের কাছে কিছু থাকে। এলাকায় তেমন বাঁশি বিক্রি না হওয়ায় ছুটি আসে শিক্ষার্থীদের কাছে। সপ্তাহে দুই তিনদিন সেই পুঠিয়া থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে শিক্ষার্থীদের কাছে বাঁশি বিক্রি করতে। এর ভিতরে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে তার আর আসা হয় না। মাঝে মাঝে স্থানীয় বাজারেও বিক্রি করে।

বাঁশি বিক্রি বাদে গনেশের অতিরিক্ত আয়ের উৎস বলতে গ্রামের গানের দল। ওতে যে টাকা পায় তা নুন আনতে পানতা ফুরানোর মতো। জীবনে সবার বড় হওয়ার ইচ্ছা থাকে তেমনি গনেশ চন্দ্র দাসেরও ছিল। ইচ্ছা ছিল সে বিখ্যাত একজন বংশীবাদক হবেন। সবাই তাকে চিনবে। কিন্তু ভাগ্য, পরিবেশ আর সময় বড় শত্রু। কখন কি হয় কিছুই বলা যায় না। তারপর তার একটাই দাবি সবাই বাঁশিকে ভালবাসুক। তাকে বোঝার চেষ্টা করুক।

তিনি বলেন, ‘আর কতদিন বা বাঁচবো ? তবে যতদিন থাকবো বাঁশির সাথেই থাকবে। যেদিন আত্মা বাঁশি থেকে চলে যাবে সেদিন আর আমি থাকবো না।


  • 1.5K
    Shares
শর্টলিংকঃ