মানবিক সমাজ গড়নে আসন্ন বাজেট বাস্তবতা

  • 167
    Shares

কদিন হল চলতি বছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব ঘোষণা হয়েছে।নানা আলোচনা সমালোচনা বিচার  বিশ্লেষণ চলছে।কেউ পক্ষে কেউ বিপক্ষে নানা মত দিচ্ছে,এ প্রসঙ্গে দুএক কথা আমিও বলতে  চাই।সরকার আমার মতামত গ্রহণ করবেন কি করবেন না সেটা পরের ব্যাপার তবে মতামত দেবার  স্বাধীনতা আমার নিশ্চয় আছে এবং একজন রাজনৈতিক শিক্ষানবিশ হিসেবে তা আমার কর্তব্যও বটে।

বাজেট আসলে কি সেটা জানা প্রয়োজন।আমরা অনেকেই বাজেট নিয়ে শোনা কথা বলে বেড়াই অথচ  নিজেরা সঠিকটা জানিনা।বাজেট একটি রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আয় ব্যায়ের হিসাব।অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট  সময়সীমার জন্য সরকার তাঁর রাষ্ট্রীয় কাজে কোথায় কত টাকা খরচ করবে বা উপার্যন করবে তার পরিকল্পিত রূপরেখা।

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকারকে তার কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়,নাগরিক চাহিদা মেটাতে নতুন রাস্তা ব্রীজ বাঁধ নির্মানের মত কাজও করতে হয়।এসব খরচের  সীমা নির্ধারন করাই বাজেট।

সরকার প্রথমে একটি বাজেট প্রণয়ন করে এবং টাকা কোথা থেকে  আসবে তা পরে নির্ধারন করে।রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে চাহিদা পূরন না হলে সরকারকে অন্য  দেশ থেকে ধার করতে হয় সে ব্যবস্থা আছে,তবে সে ধারের পরিমাণ আপনার আমার ধার করা  অর্থের চেয়ে হাজার গুণ বেশী।যদিও নির্ধারিত সময়সীমা পূরনের শেষের দিকে গিয়ে দেখা যায়  বাজেটে ঘোষিত অর্থব্যায় কমবেশি তবুও বাজেটকে ধরে নেওয়া হয় রাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির মানদণ্ড হিসেবে।

আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বাজেটের সার্বিক আলোচনা সম্ভব নয় তাই আমি এখানে শুধুমাত্র শিক্ষা এবং  সংস্কৃতি খাতে বাজেটের বিষয়ে আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করবো।  শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর একটি জাতিকে মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে প্রয়োজন শিল্প ও  সংস্কৃতি।দেশের নাগরিকদের প্রকৃত শিক্ষিত মানবিক এবং দেশ প্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে  পড়ালেখার পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতির জ্ঞান সমান প্রয়োজনীয়।বর্তমানে আমরা এক দারুণ  সংকটকাল অতিক্রম করছি।

সবকিছুর উন্নয়ন হলেও মানবিক শিক্ষা সংস্কৃতির প্রকৃতপক্ষে তেমন  উন্নয়ন হচ্ছে বলে মনে হয়না।শিক্ষা সংস্কৃতির উপর উগ্রসাম্প্রদায়িক অপশক্তির কালো ছায়া ক্রমেই  পষ্ট হচ্ছে।তথাকথিত ইসলাম রক্ষাকারী প্রকৃত উগ্রসাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী হেফাজতে ইসলামের  আবির্ভাবের পর শিক্ষা সংস্কৃতির উপর প্রবল আক্রমণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।ইতিমধ্যেই হেফাজতি  প্রেস্কিপশনে আমাদের স্কুলগুলোতে পাঠ্যসূচী পরিবর্তন করা হয়েছে সেই সাথে বাঙালি সংস্কৃতির  উপরও নানান বাঁধা দিয়ে চলেছে তারা যেমন গেলো পহেলা বৈশাখ পালনে নানা বাঁধা।

সন্ত্রাস এবং  জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো সরকার এবেলায় বারবার কেমন যেনো নতজানু হয়ে  পড়ছে।এই উগ্রসাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বাঙালি সংস্কৃতি,মুক্তিযুদ্ধের চেতনা,মুক্তবুদ্ধির  চর্চা,বাঙ্গালির হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।তাদের এজেন্ডা পষ্ট তারা এদেশকে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পক্সগু করে এক বিকলঙ্গ দেশ বিকলঙ্গ জাতিতে  রূপান্তরিত করতে বদ্ধপরিকর কারণ তারা চায় না এদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্নত রাষ্ট্রে উপনীত হোক।

তারা চায় ধর্মের নামে ব্যবসা,খেলাফত আন্দোলনের নামে ক্ষমতার নোংরা উন্মাদনা,পর্দার নামে  ঘরের কোণে অবরুদ্ধ নারী,ফতোয়ার নামে নারী ভোগের অবাধ সুযোগ।এরই সাথে চরম এক  অমানবিক সহিংস এবং ধর্ষকামী সমাজ আমাদের সভ্যতার সাথে পাল্লা দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে  উঠছে।

একমাত্র শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক লড়াই দ্বারাই এদের মোকাবেলা করা সম্ভব।এটা তারা জানে  বলেই তাদের আক্রমণ সে দিকেই বেশি।সে যাহোক এবার আসুন দেখি আমাদের সরকার মহাশয়  আসলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক এবং মানবিক সমাজ গড়তে চান  কি চান না।

ইতিমধ্যেই সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশন, উদীচী সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আসন্ন বাজেটে মোট বাজেটের ১% অর্থ বরাদ্দের দাবিতে রাজপথে নেমেছে।পত্র পত্রিকা  মারফৎ জেনেছি এবারের বাজেটে ০.১১% অর্থ সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হয়েছে,যা অপ্রতুল এবং  সরকারের বিদ্যমান নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।প্রকৃতপক্ষে  একটি আধুনিক,বিজ্ঞানভিত্তিক,অসাম্প্রদায়িক এবং দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সাংস্কৃতিক  আন্দোলনের কোনই বিকল্প নাই।

সংস্কৃতির প্রসার এবং চর্চার মাধ্যমে দেশব্যাপী একটি সাংস্কৃতিক গণ  জাগরণ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।আর এসবের জন্য চাই সরকারি প্রনদনা,অর্থ সহায়তা।কারণ  সংস্কৃতির প্রসার চর্চা অথবা আন্দোলন গড়ে তুলতেও অর্থ প্রয়োজন।সামাজিক  অবক্ষয়,সাম্প্রদায়িকতা,জঙ্গিবাদ,খুন গুম,ঘুষ দূর্নীতি,নারী শিশু নির্যাতন এর মত সামাজিক মহামারি  থেকে কেবল শিক্ষা এবং সংস্কৃতি আমাদের বাঁচাতে পারে।কাজেই সরকার মহাশয় যদি সত্যিকার  অর্থেই এসব বিষয়ে উদ্বিগ্ন এবং স্বহৃদ হন তবে এসব খাতে তাঁর অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর কথা।

কিন্তু  প্রস্তাবিত বাজেট আমাদের ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে, চলুন এবার শিক্ষা খাতের দিকটা দেখা যাক।শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো বরাবরই আন্দোলন সংগ্রাম করে এসছে আজও করছে,আমার  ছাত্র রাজনীতির জীবনে আমিও বহু আন্দোলন করেছি এনিয়ে।এবারের বাজেটে টাকার অংক বাড়লেও মোট বাজেট বাড়ছেনা শিক্ষা খাতে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শিক্ষাখাতে সবচেয়ে কম অর্থ বরাদ্দ এবং বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করে।বিভিন্ন  সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছি, ২০১১-১২ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯  কোটি টাকার যেখানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ১২.১১ শতাংশ।চলতি বছরে বাজেটের আকার বেড়ে  হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা যেখানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমে গিয়ে হয়েছে ১১.৫৩ শতাংশ।

যেখানে শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর কথা ছিল সেখানে তা কমে গেছে তারমানে আমরা শিক্ষা দিক্ষায় উন্নতি করেছি,নিশ্চয় করেছি বলেই সরকার মহাশয় এই খাতে বাজেট বাড়ানোর  প্রয়োজন বোধ করেননি।কিন্তু আসলেই কি তাই…আমাদের সমাজের দিকে তাকিয়ে আসলেই কি বলা যায় আমরা প্রকৃত শিক্ষিত হয়েছি ?।গত কয়েক বছরের তুলনা মূলক বিশ্লেষনে দেখা যায় শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ১০ থেকে ১২ শতাংশের ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

মোট বাজেট এর অর্থ বাড়ায়  শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ বেড়েছে কিন্তু বরাদ্দের হার বাড়েনি বরং কমেছে।শুধু তাই নয় দেখা যায় মোট  বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগই চলে যায় বেতন ভাতা আর অবকাঠামো উন্নয়নে।ইউনেস্কোর মত  অনুসারে উন্নত শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা রাষ্ট্র গুলোতে মোট বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ এবং
জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করতে হবে।ইউনেস্কোর চাওয়া কখনোই পূরণ করতে পারেনি  আমাদের কোন সরকার।

আমরা মোট বাজেটের ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশেই পড়ে আছি।এদিয়ে আর যাই হোক গুণগত উন্নয়ন অসম্ভব।  ফলে সে অর্থে বাজেটের টাকায় শিক্ষার খুব একটা উন্নয়ন হচ্ছেনা।তাই শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন  এবং গবেষণা মূলক শিক্ষা ব্যবস্থা অধরাই থেকে যাচ্ছে।উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে ক্রমাগত বাড়তে থাকা  শিক্ষা ব্যায় আর শিক্ষার বেসরকারি এবং বাজিন্যিকীকরণ এমনিতেই মধ্যবিত্ত এবং নিুবিত্তদের শিক্ষা থেকে দূরে ঢেলে দিচ্ছে।

এমত অবস্থায় ক্রমাগত চলতে থাকা সমাজের এ অবক্ষয় ঠেকাতে  বিজ্ঞানভিত্তিক,অসাম্প্রদায়িক,মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন ,মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক এবং গবেষণা মূলক শিক্ষা  এবং শিল্প সংস্কৃতি চর্চার কোনই বিকল্প নেই।তাই সরকারের উচিৎ এ দুই খাতে বাস্তবতার নিরিক্ষে  বাজেট প্রণয়ন করে একটি প্রকৃত শিক্ষিত এবং মানবিক সমাজ গড়ার সংকল্প হাতে নেওয়া।তবেই  এদেশ স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে।

লেখকঃ তামিম শিরাজী, সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক,  বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।


  • 167
    Shares
শর্টলিংকঃ