শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আকুতি : সমস্যা ও সম্ভাবনা

  • 698
    Shares

করোনা ভাইরাস এর প্রকোপের কারণে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকতে পারে, এমন ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কারণ, তিনি আপনাদের মত অদূরদর্শী নন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে আপনাদেরকে বিষোদগার করতে দেখেছিলাম। আমার তো মনে হয়, ২০২০ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি খুলে দেয়ার মত পরিস্থিতি আসবেনা।

বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের পরিমাণ যে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে জুনের শেষ নাগাদ দৈনিক ১০০+ লোক মারা গেলেও বিশেষ অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা। কিংবা আরো অনেক বেশী। যে লোকেরা ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসলেন, এসে করোনা ছড়িয়ে গেলেন কিংবা যারা শপিং করে করোনা বয়ে আনলেন, ইতিমধ্যে এই লোকগুলোর উপসর্গ প্রকাশ পাওয়া শুরু হয়ে গেছে।

আল্লাহ না করুক, এরা হয়তো জুনের শেষ দিক থেকে মারা যেতে শুরু করবেন। আবার, লকডাউন খোলার পরে যারা এখন আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের সিরিয়াল হয়তো আসবে জুলাইয়ের দিকে। তাতে করে ধারণা করা যায়, ঐ সময়টাতে দৈনিক মৃত্যুর পরিমাণের সংখ্যাটা এত বড় হয়ে যাবে, যা আপাতত আমাদের চিন্তাশক্তির রাডারে ধরা পড়ছেনা।

দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং ক্ষুধায় মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে লকডাউন শিথিল করার কোন বিকল্প ছিলো না আদতে। জেনে শুনেই মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে দেশকে গতিময় রাখার একটা পরিকল্পনা এটি।

এছাড়া কোন উপায়ও নেই আসলে এই মুহুর্তে। প্রশ্ন হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিৎ হবে কিনা? প্রথমতঃ দেশের অর্থনীতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর সরাসরি কোন অবদান নেই। ফলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রেখে দেশ চালাতে তেমন বেগ পেতে হবেনা। যতটা পারা যায় রিস্ক মিনিমাইজ করার চেষ্টা করবে সরকার, এটাই স্বাভাবিক। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নাও খোলা হতে পারে।

দ্বিতীয়তঃ যারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা বলে নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে স্বাস্থ্য সচেতন দাবী করছেন, বাস্তবজীবনে তারা কতখানি সচেতন ছিলেন অতীতে তা দেখলেই তাদের ভবিষ্যৎ সচেতনতা অনুমান করা যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা শিক্ষাদান কার্যক্রমে নাহয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেন, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে কিভাবে মেনে চলবেন, যেখানে দৈনিক ৩ বেলা আপনাকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যগ্রহণ করতে হয়, অন্যান্য সমস্যাগুলোও একটু চিন্তা করলেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

তৃতীয়তঃ লকডাউন খোলার কারণে লোকজন যারা নিজ নিজ কর্মস্থলে যাচ্ছেন। তারা মূলতঃ সারাদিন মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন। কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরে তার সন্তানকে নিরাপদ দেখে তারা মানসিক শান্তি অনুভব করছেন। এই সন্তানগুলো যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে অবস্থান করে, তবে এই পিতামাতারা কাজও করতে পারবেন না ঠিকমত।

সারাদিন তাদের মাথায় এই চিন্তা ঘুরপাক খাবে, ‘আমার সন্তান কি পরিস্থিতিতে আছে, কতখানি সচেতন ও নিরাপদ থাকতে পারছে।’ তারা তাদের জীবনটা দিয়ে দিতে রাজি, যে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য, সেই সন্তানকে একটা মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে রেখে কোন মানুষ শান্তিতে থাকতে পারেনা।

শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশের অভিভাবকদের কাছে সার্টিফিকেটের চেয়ে সন্তানের জীবনটা বেশী মূল্যবান। তারা হয়তো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছেলেমেয়েকে ছাড়িয়েও নিতে পারেন। -যদিও এটা সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত মতামত। এত সমস্যা মাথায় নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া মোটেও উচিৎ হবেনা। কিন্তু, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের কথাও তো ভাবতে হবে। এমনিতেই এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সিস্টেম লসে পড়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘসময় ভুগতে হয়। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোতভাবে বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে স্তিমিত হতে দেয়া কাম্য নয়।

চাকুরীর বয়সের হিসাব নিকাশটা যদি এক পাশে সরিয়েও রাখি, তবুও হতাশা ও মানসিক বিষাদের কারণে শিক্ষার্থীদের অনেকের জীবনটা দূর্বিষহ হয়ে পড়বে। আপনারা এ যুগের কিশোর-তরুণ বয়সী শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা সামরিক সরকার এরশাদের আমলের শিক্ষার্থীদের সাথে তুলনা করতে চাইলে বুঝতে হবে, দেশের জনগণের বিরাট অংশ এই কিশোর-তরুণদের মনস্তত্ব বিষয়ে আপনার কোন জ্ঞান নেই।

SSC পরীক্ষার ফলাফলের পর ক’জন আত্মহত্যা করেছে, সে খোঁজ কি রেখেছেন আপনারা? আমাদের ধ্বজভঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থার যাঁতাকলে পড়ে ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীরা মানসিক অবসাদ এবং হতাশায় ভুগে জীবন নামক রেসের ট্র্যাক থেকে অনেকেই ছিটকে পড়ছেন। আবার অনেকে অপেক্ষা করছেন সার্টিফিকেট বগলদাবা করে কর্মযজ্ঞে নামতে। যাদের পরিবার তাদের দিকে চেয়ে আছেন তাদের সন্তান কবে পরিবারের হাল ধরবে!

এই করোনা মহামারী শেষ হলে সার্টিফিকেট রেডি থাকলে তারা হয়তো কর্মজীবন শুরু করবেন। কিন্তু, মহামারীর কারণে তার সার্টিফিকেট বিলম্ব হলে, তার পরিবারের যে ক্ষতি হবে, তার দায় নিবে কে? এরকম অনেক কারণ দেখানো সম্ভব, সেদিকে গিয়ে লেখাটাকে আর দীর্ঘায়িত করছি না আপাতত। তাই, শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনের চাকাকে গতিময় রাখার বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে।

ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে এ উদ্যোগ আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। প্রথমতঃ অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চালানোর মত যথেষ্ট অবকাঠামোগত সুবিধা আমাদের নেই। আমাদের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ একটি স্মার্টফোনের ব্যয় বহন করার ক্ষমতা রাখেনা। এদেরকে অনলাইন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা আদৌ সম্ভব হবে বলে মনে হয়না।

তাছাড়া ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য ও দূর্বল গতির ইন্টারনেট সংযোগ অনলাইন পাঠদান কর্মসূচী পরিচালনার পথে অন্যতম অন্তরায়। এগুলোর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকগণের আন্তরিকতা যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও তার অধিকাংশ শিক্ষকগণ তাদের বাণিজ্যিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখার ব্যাপারে বরাবরই যথেষ্ট উদাসীন।


  • 698
    Shares
শর্টলিংকঃ