বিএমডিএ’র ২৪টি খাতে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক

  • 112
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক :

কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিএমডিএ’র ২৪টি খাতে প্রায় সাত কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। বৃহস্পতিবার দুপুরে দুদকের রাজশাহী জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।

এর আগে দুদকের অনুসন্ধান দল বিএমডিএ কার্যালয়ে যান। এসময় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশিদ উপস্থিত না থাকায় তারা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামসুল হক ও  অডিট অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) বাসুদেব চন্দ্র মহন্তসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন ও বাণিজ্যিক অডিটের কাগজপত্র দেখেন।

আলমগীর হোসেন আরো জানিয়েছেন, ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত সরকারী নিয়ম লঙ্ঘন করে বিএমডিএ’র কর্মকর্তারাদের  পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট  প্রদান, কোটেশনে কেনাকাটা নির্মাণ ও বাগান লিজসহ ২৪খাতে দুর্নীতি পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ সালে অনুমোদিত জনবল অপেক্ষা অতিরিক্ত জনবল নিয়োজিত রেখে বেতন ভাতাদি পরিশোধ করায় কর্তৃপক্ষের ১২ কোটি ৩৯ লাখ ৯ হাজার ৩৭৯ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিএমডিএ’র প্রধান কার্যালয় রাজশাহীর ২০১৫-১৬ সালের এ হিসাবটি ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত নিরীক্ষা করা হয়। এটি নিরীক্ষা করে বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের একটি অডিট টিম।

এতে অর্গানোগ্রাম, কর্মরত জনবল, আয়-ব্যয় বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রেকর্ড পত্রাদি যাচাই করে নিরীক্ষাকালে অডিট টিম দেখতে পায়, সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ১৯৯৫ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) সাংগঠনিক কাঠামোতে ৭১১টি পদ অনুমোদন করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে ৩৬টি কর্মকর্তা ও ৬৭৫টি কর্মচারীর পদ রয়েছে। পরবর্তীতে কিছু পদকে কর্মকর্তা (উপসহকারী প্রকৌশলী) পদে হওয়ায় মোট কর্মকর্তার পদ দাঁড়ায় ৭৫টি এবং কর্মচারী পদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩৬টি।

এসব পদের বিপরীতে ২০১৫-১৬ সালে বিএমডিএ প্রধান কার্যালয় রাজশাহী ও এর আওতাধীন অফিসগুলোয় ২৫৪ জন কর্মকর্তা ও ৬৬৯ জন কর্মচারীসহ মোট ৯২৩ জন নিয়োজিত রেখে বেতন ভাতাদি পরিশোধ করা হয়। ফলে অনুমোদিত জনবল অপেক্ষা অতিরিক্ত ১৭৯ জন কর্মকর্তা ও ৩৩ জন কর্মচারীসহ মোট ২১২ জন নিয়োজিত রেখে বেতন ভাতাদি পরিশোধ করায় কর্তৃপক্ষের এ বিপুল অর্থ ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এ টাকা এখনো অনাদায়ী রয়ে গেছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

 


বিএমডিএ’র নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, উচ্চতর গ্রেডে অতিরিক্ত বেতন ভাতা গ্রহণ করে পিআরএলে (অবসর) চলে গেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ। বিষয়টি জানাজানি হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরেকটি অংশ পিআরএলে ঝুলে আছেন এবং তারা হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আর উচ্চতর গ্রেডে অতিরিক্ত (প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি) বেতন ভাতা গ্রহণ করে চলেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, পরিকল্পিত ও ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত (প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি) বেতন ভাতা গ্রহণ করা হয়েছে, যা অব্যাহত আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা গেছে, বিএমডিএ’র বাণিজ্যিক অডিট শাখা ২০১২-১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের দায়সারা একটি অডিট করে। এ অডিটেই উঠে এসেছে ছয় কোটি ৬৯ লাখ ৮৫ হাজার ৫৭৯ টাকার অনিয়মের তথ্য। বিএমডিএ’র ২৪টি খাতে এ বিপুল পরিমাণ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

নথিপত্র পর্যালোচনাকালে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: আফতাবুজ্জামান ও রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক মো: কামরুজ্জামান বরাবর স্বাক্ষরবিহীন একটি লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। এতে বিএমডিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড এবং বেশি স্কেলে বা ওপরের ধাপে বেতন গ্রহণের জন্য প্রতি বছর অডিট পার্টিকে বিশাল অঙ্কের ঘুষ প্রদান বন্ধের আবেদন করা হয়।

এ দিকে বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের দু’টি অডিট টিম বিএমডিএ’র প্রধান কার্যালয় ও রাজশাহী সার্কেলের আওতাধীন ২৩টি এবং প্রধান কার্যালয়ের আওতাধীন রংপুর ও ঠাকুরগাঁও সার্কেলের ৩৩টি দফতর বা জোনের নিরীক্ষা কার্যক্রম চালায়। এর মধ্যে বিএমডিএ’র প্রধান কার্যালয় ও রাজশাহী সার্কেলের দায়িত্বে ছিলেন বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের নিরীক্ষা ও হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান।

আর প্রধান কার্যালয়ের আওতাধীন রংপুর ও ঠাকুরগাঁও সার্কেলের দায়িত্বে ছিলেন অধিফতরের নিরীক্ষা ও হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অডিট টিম ২০১২-১৮ সালের হিসাব নিরীক্ষা করে। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত নিরীক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়। বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের এই দু’টি অডিট টিম অডিট করলেও তা নিয়েও আপত্তি উঠেছে। তবে নিরীক্ষাকালে কী পরিমাণ টাকার অডিট আপত্তি উঠে এসেছে সে সম্পর্কে সূত্রটি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, দায়সারাভাবে এ অডিট করা হয়েছে। এ জন্য কাউকে কাউকে ন্যূনতম ৩০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অধিফতরের নিরীক্ষা ও হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ও সাইদুর রহমান বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়।

শ্রমিক-কর্মচারীদের আট দফা দাবি না মানায় এবং এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় রেজিস্টার অব ট্রেড ইউনিয়ন্স বিভাগীয় শ্রম অধিদফতর রাজশাহীর পরিচালক বাদি হয়ে বিএমডিএ’র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন। রাজশাহী শ্রম আদালতে বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন।

এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে বিএমডিএ’র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশিদ  বলেন, কাজ করতে গেলে অনিয়ম, অডিট আপত্তি উঠবে। আবার সেসব নিষ্পত্তিও হবে। তবে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেন তিনি


  • 112
    Shares
শর্টলিংকঃ