অভিনন্দন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সোনালী দম্পতি


অভিনন্দন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সোনালী দম্পতি

ব্রিটিশ রাজপরিবার

ব্রিটিশ রাজপরিবারের সমস্ত কাঠামো, অহংকার, ঐতিহ্য ও ইতিহাস ভেঙ্গে ‘সিনিয়র’ সদস্য প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেল রাজকীয় দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন কাল রাতে! বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ দুনিয়া বিস্মিত, হতবাক! হৈচৈ চলছে ব্রিটিশ মিডিয়া পাড়ায়! বিষয়টি আমাকে কয়েকভাবে ভাবাচ্ছে! বিশেষ করে, ট্রাম্প-বরিসন-পুতিনের এই ক্ষমতা ও দম্ভের যুগে নিজেকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের ক্ষমতার বলয় হতে মুক্ত করার মতো এতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য প্রথমেই অভিন্ন জানাচ্ছি!

১। ‘প্রোগ্রেসিভ নিউ রোল’ এর কথা বলছেন তাঁরা! কেবল রাজ পরিবারের সদস্য হয়ে রাজকীয় চাল চলনে না থেকে চাইছেন নিজের মতো করে একটি জীবন যেখানে তাঁরা একটি ‘প্রোগ্রেসিভ নিউ রোল’ প্লে করতে পারবে। এই দম্পতি পুরো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিস্টেমকে আঘাত করতে যাচ্ছে কিনা, এখন সেটাই দেখার বিষয়! কিংবা বলা যায়, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজ পরিবারের প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হল কিনা!

rasheকিংবা সামনে আদৌ আর রাজপরিবারের ধারনা ব্রিটিশদের মনে গুরত্বপূর্ণ জায়গায় থাকবে কিনা সন্দেহ তৈরি করেছে নিশ্চিতভাবেই। খুবই স্পষ্টভাবে তাঁরা ‘অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন’ জীবন যাপনের কথা বলে দিয়ে ব্রিটিশদের অর্থে ‘রাজপরিবার’ এর কাঠামো পরিচালনার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এলেন কিনা, তাও ভেবে দেখার বিষয়! ‘পাবলিক ফান্ডডেড’ পরিসরে তাঁরা আর থাকতে চাইছেন না। হয়তো অচিরেই অন্য সাধারণ ব্রিটিশদের মতো তাদের কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে দেখবো!

২। তাঁরা জানিয়েছেন, রানীকে সাপোর্ট দিয়ে যাবেন! তাতো দিতেই হবে! ব্রিটিশ নাগরিক মাত্রই দিতে হবে, তাঁরা তো রাজপরিবারের!

৩। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সামনের তিনজন রাজা অলরেডি নির্ধারিত হয়ে গেছে, প্রিন্স চার্লস, তারপর প্রিন্স ওইলিয়ামস, এবং তাঁর ছেলে প্রিন্স জর্জ! অতএব এখানে প্রিন্স হ্যারির আসলে আর ভূমিকা নেই, সেটি বুঝতে পেরেই হয়তো নিজের ব্যক্তিত্বকে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

৪ । ইউকে এবং নর্থ আমেরিকা দুই জায়গায় মিলিয়ে থাকতে চান তাঁরা! কারণ সন্তানকে ‘রয়েল’ পরিসরে গড়ে তোলার পাশাপাশি একেবারেই সাধারণ পারিবারিক পরিসরেও বেড়ে তুলতে চান। আমি স্যলুট জানাই এই সিদ্ধান্তকে।

৫ । যদিও বাকিংহাম প্যালেস তাদের এই সিদ্ধান্তকে ‘জটিল’ বলে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে! আশা করছে, তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও হতে পারে! বাকিংহাম হতে বলা হয়, “আমরা বুঝতে পারছি তাদের “ভিন্ন ধরণের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আগ্রহ’ কিন্তু এটা অনেকটা ‘জটিল’! তাদের সাথে আমাদের আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে, আমরা এই নিয়ে কাজ করছি।

৬ । ভাবছি, রানী এই মুহূর্তে কি ভাবছে? একজন গ্র্যান্ডমাদার হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ? নাকি অতি অল্প বয়সে পৃথিবীর কিউট মাকে হারানোর পর একজন সন্তান তাঁর ক্ষমতাধর দাদীকে কোন বার্তা দিলো?

৭। পুরো ব্রিটিশ জাতি হতবাক কালকের এই ঘোষণার পর! রয়েল ফ্যামিলি কি একধরনের হুমকির মাঝে পড়লো? বেশিরভাগ ব্রিটিশদের মুখের অভিব্যাক্তি বলছে, তাঁরা হতাশ, হতবাক ও উদগ্রীব! কেউ কেউ মেগান কে দোষারোপ করছে।

৮ । একটি বিষয় হচ্ছে, মেগান খুব সেলফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পারসন! মেগান ‘লোক দেখানো’ চ্যারিটির চেয়ে খুব বেশি আগ্রহী সত্যিকারের কাজ করার প্রতি। সারাক্ষণ মিডিয়ার তৈরি সাদা চামড়ার সাজানো গুছানো ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের পুতুল বউ ‘কেট’ এর সাথে কালো চামড়ার আফ্রিকান আমেরিকান হিসেবে সারাক্ষণ যে তুলনার চর্চা চলছে, সেটা হতেও হয়তো মুক্তি চেয়েছেন!

প্রচণ্ড আত্মনির্ভরশীল মেগান এর জন্য এই ধরনের রাজতন্ত্রের পুতুল বউ হওয়া হয়তো মেনে নেয়া সম্ভব হচ্ছিলনা, আর মায়ের অভিজ্ঞতা হতে হয়তো মিডিয়ার এই চাপ নিজেও নিতে চাইছিলেন না প্রিন্স হ্যারি! কারণ হ্যারি বেশ বিরক্ত ছিল ফ্যামিলি প্রাইভাইসি থাকছেনা বলে। আর আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এই চাপটা নেয়া আরও কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে বিশেষ করে যখন তিনি বিয়ে করেছেন একজন আফ্রিকান আমেরিকানকে! এই চাপ যেন তাঁর সন্তানের উপর না পড়ে, সেটাও হয়তো তাদের মূল বিবেচনা হিসেবে কাজ করেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমার সবসময়ই মনে হয়েছে, হ্যারি বরাবরই মায়ের মৃত্যুর পর কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন যা কোন না কোনভাবে ব্রিটিশ রাজপরিবার কে কিছু শক্ত মেসেজ দেবে, রাজপরিবারের কাঠামোকে আঘাত করে, অহংকারকে ম্রিয়মাণ করে। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের মতে,তিনি বিয়ে করেছেন রাজপরিবারের সকল ইতিহাস ভেঙ্গে দিয়ে, শ্বেতাঙ্গদের অহংকারকে চূর্ণ করে দিয়ে……

তবে নিজের পেশার দিকেও মনোযোগী ছিলেন, এবং কালকের এই ব্রিটিশ রাজপরিবার এর দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে নিজেকে ‘মুক্ত’ করেছেন ব্রিটিশ রাজপরিবার এর মায়াজাল, কারাগার, আকর্ষণ যাই বলি না কেন তা হতে! এতো বড় সিদ্ধান্ত নেয়া কোনভাবেই সহজ ছিলোনা অনুমান করা যায় ব্রিটিশ গণমাধ্যমের হই চৈ পড়া দেখে! হ্যাটস অফ টু উ, প্রিন্স হ্যারি! মায়ের মতোই সাধারণের হয়ে উঠলেন এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে! অভিনন্দন, সোনালী দম্পতি (গোল্ডেন কাপল বলেন অনেকেই তাদের, আমিও বলছি)!!

লেখক : রাশেদা রওনক খানসহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন জিপিএ ৫- অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মত্ত আমরা আসলে কী করছি?


শর্টলিংকঃ