৪৮ হাজার ছাড়াল ডেঙ্গু রোগী


ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অব্যাহত আছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ। গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ১৯২৯ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।


এ নিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮২২০ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন ৪০৬৭০ জন।

আর এ মুহূর্তে ৭৫৭০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদিকে বৃহস্পতিবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

তাদের মধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং একজন চিকিৎসকের শিশু সন্তান আছে। এ নিয়ে চলতি আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত বেসরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩।

যদিও সরকারি হিসাবে গত ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এই সংখ্যা ৪০ জন। বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র মতে, আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

কারণ হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিজ বাসায় চিকিৎসা করাচ্ছেন। আবার সব বেসরকারি হাসপাতাল নিয়মিতভাবে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য-উপাত্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরে সরবরাহ করছে না।

পাশাপাশি প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভর্তি আর ছাড়পত্রের সংখ্যা কাছাকাছি থাকায় হাসপাতালগুলো থেকে ডেঙ্গু রোগীর ভিড় কমছেই না। ফলে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের হাসপাতালে রোগীর ভিড় লক্ষণীয়।

অনেক হাসপাতালে অতিরিক্ত সিটের (শয্যা) ব্যবস্থা করেও রোগীর সংকুলান হচ্ছে না। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতে পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসা চলছে।

অষ্টম দিনের মতো বৃহস্পতিবারও ঢাকার তুলনায় রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেশি পাওয়া গেছে।

এদিন স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় বৃহস্পতিবার (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।

বুধবার হাসপাতালে নতুন রোগী ছিল ১৮৮০ জন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ১৯২৯ জন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৮১১ জন আর ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছে ১১১৮ জন।

গত ৮ আগস্ট থেকে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর আগে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, ঈদের ছুটিতে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধির হার বাড়তে পারে। মূলত ঈদের ছুটিতে মানুষ রাজধানীসহ বড় শহরগুলো ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আক্রান্ত এবং ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, বেশির ভাগ ঢাকাসহ বড় শহরে কর্মসূত্রে অবস্থান করছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর তারা গ্রামে চলে গেছেন। যদিও সরকারি তরফে ডেঙ্গু আক্রান্তদের গ্রামে যেতে বারবার নিষেধ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, সাধারণত বাংলাদেশে আগস্ট মাসে বৃষ্টি-বাদলের প্রবণতা বেশি। গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। তবে যে ধারায় বৃষ্টি হলে এডিস মশার লার্ভা ভেসে যাবে সেই ধারায় হচ্ছে না। ফলে এই বৃষ্টিতে এডিস মশার বিস্তার ও উৎপাত না কমে বরং বেড়ে যেতে পারে।

ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যেতে পারে। তবে আশার কথা হচ্ছে, সরকারের পদক্ষেপ আর গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রচারের ফলে মানুষ সচেতন হয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে এডিসবিরোধী কার্যক্রম চলছে।

বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রকাশিত ডেঙ্গু সংক্রান্ত বুলেটিন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৪৮২২০ রোগীর মধ্যে সর্বাধিক ২৯ হাজার ৮১৯ জনই চলতি মাসের।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৮১১ রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩১ জন। এছাড়া মিটফোর্ডে ৬৭, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ২৫, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৬৬, বিএসএমএমইউতে ২১, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ১৩, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০৯, বিজিবি হাসপাতাল পিলখানা ঢাকায় ৫, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ২৩, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৬৫ জন। এ সময় রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ২৮৬ জন ভর্তি হয়েছেন।

অপরদিকে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে মোট আক্রান্ত ১১১৮ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৯৫ জন (ঢাকা শহর বাদে), চট্টগ্রামে ২০৯, খুলনায় ১৫১, রংপুরে ৮১, রাজশাহীতে ১৩০, বরিশালে ১৭১, সিলেটে ২৫ ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

মৃত ৫ জন : গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৫ জন মারা গেছেন। ঢাকা শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তার নাম রাজ চৌধুরী। রাজের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর দশ মাস।

সে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. নির্মল কান্তি চৌধুরীর ছেলে। শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শাহীন শরীফ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রাজকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসে তার পরিবার। ভর্তির পর সরাসরি তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। অপর চিকিৎসক ডা. পীযূষ বিশ্বাস বলেন, চারদিন জ্বরে ভোগার পর রাজকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কিন্তু সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে শিশুটিকে ঢাকা শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করা হয়। দুইদিন আইসিইউতে থাকার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজ মারা যায়।

সে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ছিল। এ নিয়ে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৯ জন মারা গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুল হাকিম।

মাদারীপুর ও টেকেরহাট প্রতিনিধি জানান, সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের বড়াইলবাড়ী গ্রামের জদুনাথ মণ্ডলের ছেলে তপন কুমার মণ্ডল (৩৫) ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান।

মৃত তপন মাদারীপুর সদর এলাকার স্বাস্থ্য সহকারী ছিলেন। সিভিল সার্জন অফিস ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদরে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী তপন কুমার মণ্ডল ১৬ দিন পূর্বে সরকারি আদেশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫৮ নং ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য যায়। সেখানে কর্তব্যরত অবস্থায় গত ১১ আগস্ট ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়।

ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এলে অসুস্থতা বাড়লে প্রথমে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। শরীরে প্লাটিলেটের পরিমাণ ত্রিশ হাজার ছিল। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে বুধবার থেকে আইসিউতে থাকার পর বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে মারা যায়। মাদারীপুর সিভিল সার্জন মো. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এই নিয়ে মাদারীপুরে ডেঙ্গুজ্বরে ৭ জনের মৃত্যু হল।

বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৌসুমী আক্তার (২৫) নামে আরেক নারীর মৃত্যু হয়। তার স্বামীর নাম মো. মামুন। তার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায়।

এই দম্পতি ঢাকার আগারগাঁওয়ের মোল্লাপাড়ায় থাকতেন। মৃত্যের স্বামী মামুন জানান, বেশ কিছু দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন মৌসুমী। বুধবার মহাখালী টিবি হাসপাতালে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে বুধবার তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে জরুরি বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, শাহরাস্তিতে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে আবু বকর শিহাব (১০) নামে এক শিশু বুধবার সন্ধ্যায় মারা গেছে। শিহাব উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া নোয়া বাড়ির মো. জাকির হোসেনের ছেলে।

সে ঈদের কয়েকদিন আগে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়। তখন তাকে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ঢাকা নেয়ার পথে দাউদকান্দি ব্রিজের কাছে শিহাব মারা যায়। শিহাব স্থানীয় হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পড়ত। সে কোরানের ১৬ পারা মুখস্থ করেছে।

মাগুরা প্রতিনিধি জানান, মাগুরা সদর উপজেলার নরসিংহাটি গ্রামে বৃহস্পতিবার দুপুরে জয়নাল শরীফ (৫২) নামে ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি ওই গ্রামের আবদুল গফুর শরীফের ছেলে।

মৃতের ভাই হারুনর রশিদ জানান, জয়নাল শরীফ ঢাকার একটি বেসরকারি সিকিউরিটি সার্ভিসে চাকুরীরত ছিলেন। ১০ আগস্ট ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে অসুস্থ হলে তাকে মাগুরা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সেখানে তার শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ওইদিনই তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয় জানিয়ে ঢাকায় নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু পরিবারের লোকজন তাকে বুধবার মাগুরায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলে বৃহস্পতিবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়

Print Friendly, PDF & Email

শর্টলিংকঃ