দস্তয়েভস্কির অভাজন

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

ফিওদর দস্তয়েভস্কি (১৮২১-১৮৮১)-এর পয়লা উপন্যাস ‘অভাজন’-এর কথা নিশ্চয় আমাদের মনে আছে! চিঠির আদলে ১৮৪৪-৪৫ সালে লিখা হয়েছিল উপন্যাসটি। রুশভাষায় তা ছাপা হয়েছিল ১৮৪৬-এ। উপন্যাসটিতে সেইন্ট পিটার্সবুর্গের পৌঢ় এক কেরানি মাকার দেভুশকিন ও তরুণী ভারভারা আলেক্সেয়েভনা (যাকে মাকার দেভুশকিন ‘ভারেঙ্কা’ বলে সম্ভাষণ করে প্রায়ই) পরস্পরকে নিয়মিতভাবে চিঠি লিখছে। চিঠিগুলোয় তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে পরস্পরের প্রতি অনুরাগ, বন্ধুত্ব ও যৌথতার স্বাক্ষর। তাদের চিঠিগুলোর ভেতর দিয়ে আমরা যা জানছি তা ভয়ংকর—জার প্রথম নিকোলাস (১৭৯৬-১৮৫৫)—এর স্বৈরতন্ত্রের শেষ দিকে রুশদেশের নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন ভরে উঠেছে সীমাহীন দারিদ্র্যে, আয়বৈষম্যে। দস্তয়েভস্কির এসব সাধারণ মানুষের ভেতরে রয়েছে কেরানি, ভিখেরি, মুচি, দিনমজুর ইত্যাদি পেশার খেটে খাওয়া মানুষের দল ও বেকার জনগোষ্ঠী। এ প্রবন্ধে আমরা উনিশ শতকের মাঝামঝি দারিদ্র্যে নিপতিত রুশদেশের এমন কিছু মানুষের জীবনের দুঃখকষ্টের খবর নেয়ার চেষ্টা করব।

ব্যর্থ কেরানি মাকার দেভুশকিন এবং সেলাইকর ভারভারা আলেক্সেয়েভনা বা ভারেঙ্কা ‘অভাজন’ উপন্যাসের মুখ্য দুটি চরিত্র। ভারেঙ্কাকে লেখা মাকার দেভুশকিনের চিঠিগুলো থেকে দেখা যায়, সেইন্ট পিটার্সবুগের্র কোনো একটি অফিসে (সম্ভবত সরকারি অফিসই হবে) ১৭ বছর বয়সে কেরানি হিসেবে কাজ শুরু করেছিল মাকার দেভুশকিন। গল্পটি যখন গড়ে উঠছে ততদিনে ৩০ বছর একই অফিসে গেঁতোর মতো কাজ করা হয়ে গেছে তার। তার ব্যক্তিত্ব মোটেই চোখা কিছু নয় বলে উঠতে-বসতে সে তার নিজের অফিসে নানা নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। সুখতলী ক্ষয়ে যাওয়া বুটজুতো পায়ে দিয়ে, গায়ে বিবর্ণ কোট ও মাফলার চাপিয়ে সে প্রত্যহ অফিস করতে যাচ্ছে। খুলে পড়ছে তার কোটের দু-একটি বোতাম। বোতামগুলো প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে না, কেননা অফিসের সহকর্মীদের সামনে নিজেকে ভদ্রস্থভাবে উপস্থাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তার নেই। স্বল্প বেতনে এ মানুষটি চলতে পারছে না কিছুতেই! এদিকে তাকে বারবার অফিস থেকে বেতনের বিপরীতে অ্যাডভান্স তুলে খেতে হচ্ছে। তাই গরিবানা হালে থাকাটাই ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তার বেলায়। এই সেইন্ট পিটার্সবুর্গে গড়ে ওঠা তখনকার জরাজীর্ণ একটি কোয়ার্টারে বর্তমানে থাকছে নিঃসঙ্গ মাকার দেভুশকিন। কোয়ার্টারটিতে গাদাগাদি লাগিয়ে বাস করছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। কোয়ার্টার তো নয়—বস্তি! সেখানে রান্নাঘরের বর্ধিত একটি অংশে তার বাস। অর্থসংকটে থাকার কারণে দীর্ঘদিন বাকি পড়ে আছে বড়িভাড়া। আর তাই খান্ডারনী বাড়িওয়ালি তাকে লাথি মেরে বের করে দেয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে বসে আছে। এসব নিয়ে মাকার দেভুশকিনের হীনমন্যতার কোনো শেষ নেই! এক চিঠিতে সে ভারেঙ্কাকে লিখছে, সেই হীনমন্যতারই কথা: ‘আমি তো একটা নগণ্য লোক, অতি মামুলি একটা মানুষ!’

তরুণী ভারভারা আলেক্সেয়েভনা বা ভারেঙ্কা আমাদের মাকার দেভুশকিনের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়া। মাকার দেভুশকিনের বর্তমান ঠিকানার জানালা থেকে উল্টোদিকের কোয়ার্টারের ছোট্ট এক ঘরের বাসিন্দা ভারেঙ্কার জানালা দেখা যায়। মাকার দেভুশকিনকে লেখা ভারেঙ্কার চিঠিগুলো বলছে, ভারেঙ্কা আর তার বন্ধু ফেদোরা একই ঘরে ভাড়া থাকে। একদা গ্রাম থেকে সেইন্ট পিটার্সবুর্গে অভিবাসিত হয়েছিল ভারেঙ্কার পরিবার। শহরটায় বাসাও কিনেছিল তার বাবা। পরে ব্যবসা পড়ে যায় তার বাবার এবং সঙ্গত কারণেই ধারদেনায় ডুবে যায় পরিবারটি। হঠাৎ একদিন বাবার মৃত্যু হলে তাদের দারিদ্র্য বেড়ে যায় বহুগুণে। শেষমেশ ভারেঙ্কার মা তাদের বাসাটি বিক্রি করে পরিবারের ধারদেনা পরিশোধ করে বটে, কিন্তু এভাবে শেষ হয়ে যায় বাড়ি বেচে পাওয়া সমুদয় অর্থ। অগত্যা ভারেঙ্কার মৃত বাবার জনৈক আত্মীয়া—আন্না ফিওদরভনার আশ্রয়ে উঠে যায় ভারেঙ্কারা। সেখানে তাদের বাসাভাড়া দিতে হয়নি, খাবারের জন্য টাকাপয়সা লাগেনি বলে সেটাই ছিল দারিদ্র্যে নিপতিত পরিবারটির জন্য উত্তম একটি সমাধান। তবে যা হয়—আশ্রয়দাত্রীর হাতে লাগাতার অসম্মানিত হতে হয়েছে তাদের। সেখানেই মৃত্যু ঘটে দীর্ঘদিন ধরে রোগেশোকে ভুগতে থাকা ভারেঙ্কার মায়ের। তাদের দারিদ্র্য এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা পর্যন্ত করানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি ভারেঙ্কার পক্ষে। মায়ের মৃত্যুর পরে আন্না ফিওদরভনার আশ্রয় পরিত্যাগ করে বর্তমানের কোয়ার্টারে উঠেছে নিঃসঙ্গ, অনাথ ভারেঙ্কা। এ কোয়ার্টারটাও মাকার দেভুশকিনের কোয়ার্টারের মতোই জরাজীর্ণ। এখানেও মানুষে মানুষে গাদাগাদি লেগেছে একবারে! তাদের বেশির ভাগই আবার নিম্নবিত্ত।

রুশদেশের তত্কালীন রাজধানী সেইন্ট পিটার্সবুর্গে ভারেঙ্কার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক চাকরিবাকরি মেলেনি। রুশদেশের অর্থনীতিতে তখনো কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি—প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ক্ষেতখোলায় কাজ করছে, যাদের মাথার ওপরে জগদ্দল হয়ে বসে আছে সামন্তপ্রভুরা, শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে গুটিগুটি পায়ে, গ্রাম থেকে বড় শহরগুলোয় সবে অভিবাসন ঘটাতে শুরু করেছে নিঃস্ব ক্ষুদ্র কৃষক-পরিবারগুলো। কাজেই এ বাস্তবতাতে সেই সময়টায় সেইন্ট পিটার্সবুর্গের সেবাখাতে কাজবাজ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সেই শহরে আর দশজনের মতোই ভারেঙ্কা এমন একজন বেকার। তাকে পোশাক সেলাইয়ের মতো স্বকর্মই অলম্বন করতে হয়েছে শেষতক। বেকার হলেও তো তাকে বাড়িভাড়া দিতে হচ্ছে নিয়মিতভাবে, তাকে ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে, সামান্য কিছু হলেও দানাপানির! এমন একটি পরিস্থিতিতে পোশাক সেলাইয়ের অর্ডার জোগাড় করে আনছে ভারেঙ্কার বন্ধু ফেদোরা এবং তারা দুজনে মিলে বাসায় বসে মেশিনে পোশাক সেলাই করছে। মজুরি দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে তার জীবন চলছে বটে, তবে সঞ্চয় করে ওঠা আর সম্ভব হচ্ছে না কিছুতেই। এদিকে গায়ে চড়ানোর মতো ভারেঙ্কার কোনো কোট নেই বলে সেইন্ট পিটার্সবুর্গের বরফশীতল আবহাওয়ায় থাকতে থাকতে কাশিসহ ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ছে ভারেঙ্কা। চিকিৎসা করার মতো পয়সা তার পকেটে নেই স্বাভাবিকভাবেই। এভাবে নিজের দারিদ্র্যের ভার আর টানতে পারছে না ভারেঙ্কা।

এতক্ষণ আমরা ‘অভাজন’ উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র—মাকার দেভুশকিন ও ভারেঙ্কার দারিদ্র্য সম্পর্কে যা কিছু তথ্য দিয়েছি, সেগুলো এবার জড়িয়ে যাবে তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে। আমরা দেখব, ভারেঙ্কার এ দুরাবস্থায় তাকে নানাভাবে সাহায্য করতে নামবে মাকার দেভুশকিন। ভারেঙ্কা তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়াই কেবল নয়, সে তার প্রেমিকাও বটে। এর ভেতরেই মাকার দেভুশকিন তার পুরনো ডেরা ছেড়ে উঠে এসেছে ভারেঙ্কাদের পাড়ায়—ভারেঙ্কার নয়া ঠিকানার ঠিক উল্টোদিকে, কম ভাড়ায়। এবার আমরা দেখব, ভারেঙ্কাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে অফিস থেকে বেশি বেশি করে অ্যাডভান্স নিচ্ছে মাকার দেভুশকিন; নানা উৎস থেকে সে ধারকর্জও করছে; ভারেঙ্কার জন্য সে ফুল, মিষ্টি, ব্লাউজ ইত্যাদি কিছু উপঢৌকনও পাঠাচ্ছে প্রায়ই। একবার ভারেঙ্কা যখন ঠাণ্ডায় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তখন সে তার একটা কোট বিক্রি করে ভারেঙ্কার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র জোগাড় করেছে; ভারেঙ্কাকে গরম কোট কিনে দেয়ার পরিকল্পনাতেও সে ব্যস্ত; ভারেঙ্কাকে থিয়েটারেও নিয়ে যেতে জোড়াজুড়ি করছে সে ইত্যাদি (বেতন এবং অফিস থেকে নেয়া অ্যাডভান্স দিয়ে মাকার দেভুশকিনের নিজেরই যেখানে চলছে না!)। তারপর আমরা দেখব, নিজের এবং ভারেঙ্কার চলার জন্য অর্থের ব্যবস্থা করতে সে উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু লিমিট পার হয়ে যাওয়ায় অফিস থেকে আর কিছুতেই সে অ্যাডভান্স নিতে পারছে না। অগত্যা সে বদ্ধপরিকর হয়েছে উচ্চ সুদে ধার নেয়ার জন্য। ৪০ রুবল ধার নিতে মার্কভ নামের জনৈক সুদের কারবারির পায়ে সে হত্যেও দিচ্ছে। ৪০ রুবল পেয়ে গেলে সে যেসব কাজ করতে চায় তার তালিকাটি এমন: ভেরেঙ্কাকে সে দিয়ে দেবে ২৫ রুবল, তার নিজের বাড়িওয়ালার দেনাশোধে যাবে ২ রুবল, বাকি ১৩ রুবল দিয়ে সে নিজের জন্য কিনবে এক জোড়া বুট, গলাবন্ধ রুমাল একটি, কোটের বোতাম আর তামাক এবং যা বাঁচবে তা সে লাগিয়ে দেবে তার একার সংসারের খরচা বাবদ। কিন্তু জামানত রাখার মতো কোনো সম্পদ তার নেই বলে শেষ পর্যন্ত সে মার্কভের কাছ থেকে ৪০ রুবল ধার নিতে ব্যর্থ হয়। মাকার দেভুশকিনের দারিদ্র্য তখন এতই চরমে উঠেছে যে তার পকেটে প্রাত্যহিক খাবার সংগ্রহের মতো পয়সাও আর অবশিষ্ট নেই! কাজেই তাকে নিজের স্বল্প রোজগার থেকেই সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে ভারেঙ্কা স্বয়ং। মাকার দেভুশকিনের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য দুই চালানে ভারেঙ্কা মাকার দেভুশকিনকে ৫০ কোপেক পাঠাচ্ছে। তবে এ সামান্য অর্থ দিয়ে তো আর মাসের পর মাস বাকি পড়ে থাকা বাড়িভাড়া শোধ করা যায় না! তাই মাকার দেভুশকিনের বাড়িওয়ালি একদিন মাকার দেভুশকিনকে ঘরেই ঢুকতে দিচ্ছে না এবং মাকার দেভুশকিন তখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডার ভেতরে কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে রাত কাটাচ্ছে।

ফিওদর দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘অভাজন’-এর চিঠিগুলোয় আমরা আরো তিনজন দরিদ্র মানুষের উপস্থিতি দেখতে পাব—প্রক্রোভস্কি, প্রক্রোভস্কির বাবা ও গরশকোভ। ভারেঙ্কাদের আত্মীয়া—আন্না ফিওদরভনার বাসায় যখন ভারেঙ্কা আর তার মা আশ্রিত ছিল, তখন ওই একই বাসাতে আন্নার আশ্রয়ে থেকেছে এই প্রক্রোভস্কি। সেইন্ট পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র—তরুণ প্রক্রোভস্কি (ভারেঙ্কার সঙ্গে একদা যার প্রেম গড়ে উঠেছিল) তখন শারীরিক অসুস্থতার কারণে ছাত্রত্ব ঘুচিয়েছে এবং আশ্রয়ের বিনিময়ে সে পড়াচ্ছে আন্না ফিওদরভনার ভাইঝি—সাশাকে। তাই প্রক্রোভস্কি মাগনা খাবার-দাবারও পেয়ে যাচ্ছে নিয়মিতভাবেই। বস্তুতপক্ষে, প্রক্রোভস্কির সামনে সুন্দর কোনো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত ছিল না। প্রক্রোভস্কির বুড়ো বাবা তার ছেলেকে আন্না ফিওদরভনার বাসায় দেখতে যেত প্রায়ই। প্রক্রোভস্কির মাতাল বাবা ছিল একজন সামান্য কেরানি। সে আসত বিবর্ণ একটি কোট গায়ে দিয়ে। তার টুপিটা ছিল ন্যাতার মতো—দলামোচড়া, ফুটোফাটা এবং কানাভাঙা। অতি সন্তর্পণে সে প্রক্রোভস্কির ঘরে ঢুকত এবং বেরিয়েও যেত একইভাবে। কেরানির জীবনের অবদমনই নিশ্চয় তাকে স্বভাবে এমন ভীরু বানিয়ে দিয়েছিল! পরে, আন্না ফিওদরভনার আশ্রয়ে থাকাকালীন এ তরুণ প্রক্রোভস্কি যক্ষায় আক্রান্ত হয়েছিল এবং যা হয়—বিনা চিকিৎসাতেই মৃত্যু ঘটেছিল তার।

গল্পটিতে গরশকোভ নামের আরেকজন কেরানিরও আমার দেখা পেয়ে যাই। মাকার দেভুশকিন যে কোয়ার্টারে থাকে সেই কোয়ার্টারেরই একজন ভাড়াটে এ গরশকোভ। গরশকোভের ছোট ছেলে একবার স্কার্লেট ফিভারে ভয়ানকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। গরশকোভের কাছে তখন চিকিৎসা করার মতো অর্থ ছিল না বলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণও করেছিল সেই শিশুটি। আরো পরে অফিসের টাকা আত্মসাতের মিথ্যে মামলায় ফেঁসে যাওয়ায় চাকরি চলে গিয়েছিল গরশকোভের এবং সে সংসারের খরচ টানতে পারছিল না কিছুতেই। জীবনের কাছে পরাজিত বেকার গরশকোভ একদিন হঠাৎ মারা গিয়েছিল, হয়তোবা তীব্র মানসিক চাপেই।

তোষ্য কেরানি মাকার দেভুশকিনের ভাগ্য আচমকা খুলে যায় একদিন। মাকার দেভুশকিনের চেহারায়, পোশাকে দারিদ্র্যের সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ করার পর তার অফিস-প্রধানের মনে করুণার উদ্রেক ঘটে এবং তখন সে নিজের পকেট থেকে মাকার দেভুশকিনকে ১০০ রুবল দান করে ইচ্ছেমতো খরচ করার জন্য। তখন যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেল মাকার দেভুশকিন! সেই ১০০ রুবল থেকে সে ভারেঙ্কাকে পাঠাল ৪৫ রুবল, বাড়িওয়ালিকে সে দিয়ে দিল ২০ রুবল বাকি বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে, পোশাক মেরামত করার জন্য সে রাখল আরো ২০ রুবল, বাকি ১৫ রুবল সে রাখল তার একার সংসারের অন্যান্য খরচ নির্বাহের জন্য। তবে ২০ রুবল রেখে মাকার দেভুশকিনকে ২৫ রুবল ফেরত পাঠাল ভারেঙ্কা; অনুরোধ করল মাকার দেভুশকিন যেন বাজে খরচ না করে টাকাপয়সা কিছু সঞ্চয় করে।

মাকার দেভুশকিনের এ আনন্দের ভেতরেই ভারেঙ্কা ঘোষণা দিল যে সে বীকভ নামের তার পূর্বপরিচিত জনৈক ধনাঢ্য জমিদারকে বিয়ে করতে চায়। স্বভাবতই ভারেঙ্কার এ সিদ্ধান্তে মুষড়ে পড়ল মাকার দেভুশকিন। ভারেঙ্কা যুক্তি দিল, তার নিজের শারীরিক অসুস্থতা কোনোদিন আর ভালো হবে না, তার দারিদ্যও আর ঘুচবে না কখনই এবং তাই কারো না কারোর ওপরে তাকে বোঝা হয়ে থাকতেই হবে সারা জীবন। বীকভই তেমন একজন সক্ষম মানুষ, যার পক্ষে ভারেঙ্কার বোঝা কাঁধে নেয়াটা সম্ভব। কাজেই ধনকুবের বীকভের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সে আর না বলেনি। ভারেঙ্কা জানাল, তার এ সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মাকার দেভুশকিন যেন তাকে ফেরানোর চেষ্টা না করে! মাকার দেভুশকিন তবু অনেক অনুনয় করেছিল: বীকভের সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়ে গেলে তুমি স্তেপের কোনো এক গ্রামে চলে যাবে। আমার মতো নিঃসঙ্গ একজন কেরানিকে তখন চিঠি লিখবে কে, কেইবা নেবে তার খবরসবর? তবু ‘সুখ হোক তোমার…আমায় মনে রেখ…তোমায় আমি ভুলব না…আমি জানতাম তুমি আমায় ভালবেসেছ…হতভাগিনী ভারেঙ্কাকে তোমার মনে রেখ। খুব ভালবাসত সে তোমায়…।’-এ কথাগুলোই লেখা ছিল ভারেঙ্কার শেষ চিঠিতে। তো বিয়ে করে স্বামী বীকভের সঙ্গে স্তেপের এক গাঁয়ে চলে গেল আমাদের ভারেঙ্কা। দারিদ্র্য ভারেঙ্কাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল মাকার দেভুশকিনের কাছ থেকে। এ দুজন দরিদ্র মানুষের কাপুরুষতা, ভীরুতাই এখানে বাজে: ভবিষ্যতে তার নিজের দারিদ্র্যের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে যাতে পারে—এ আশঙ্কা থেকেই নিশ্চয় মাকার দেভুশকিনের সঙ্গে জীবন কাটার ঝুঁকি আর নেয়নি ভারেঙ্কা এবং একই ধরনের ভাবনা থেকে ভারেঙ্কাকে আটকাতেও যায়নি মাকার দেভুশকিন; নিজের ব্যর্থতার গ্লানি আর দুঃখ ভুলতে কাপুরুষ মাকার দেভুশকিন কেবল ডুবে গেছে অ্যালকোহলে।

ফিওদর দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘অভাজন’ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সামন্ততান্ত্রিক রুশদেশের দারিদ্র্য মানুষের গল্প। দীর্ঘদিন দারিদ্র্যের ভেতরে থাকলে যে মানুষের মনোবল পটপট করে ভেঙে যায়; সে হয়ে যায় ভীরু, কাপুরুষ—‘অভাজন’ উপন্যাসে দস্তয়েভস্কি এটিই দেখিয়েছেন আমাদের। উপন্যাসটিকে অসাধারণ করে তুলেছে তার এ মনোবীক্ষণ। মাকার দেভুশকিন, ভারেঙ্কা, প্রক্রোভস্কি, প্রক্রোভস্কির বাবা ও গরশকোভের মতো রুশদেশের অজস্র দরিদ্র কেরানি ও বেকারেরাই বিংশ শতকের শুরুতে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। দেশটির সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে এবং তাদের প্রতিনিধি জার দ্বিতীয় নিকোলাসের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ করেছিল মেহনতি শ্রমিকদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে; নিয়ে এসেছিল ‘অক্টোবর বিপ্লব’; গড়ে তুলেছিল নতুন এক রুশদেশ। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে তখনকার রুশদেশের দারিদ্র্যের সমাধান হিসেবে ‘অক্টোবর বিপ্লব’-এর মতো দুনিয়া কাঁপানো কোনো বিপ্লব কামনা করেননি দস্তয়েভস্কি। বরঞ্চ ধর্মের পথেই তিনি তার রুশদেশকে সঁপে দিয়েছিলেন। তবু এটি মানতে হবেই ‘অভাজন’ উপন্যাসে তিনি কেঁদেছেন রুশদেশের আপামর দরিদ্র মানুষের জন্য; পাঠকদেরও কাঁদিয়েছেন। এমন মানবিক হতে পারেন ক’জন লেখক?

 

ফয়জুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক


  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
শর্টলিংকঃ