ম্যাগনেটের বিপদে ভূতুম প্যাঁচা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইউএনভি ডেস্ক: 

মাছের ঘেরের পাড়জুড়ে মাচানে লাউগাছের বাড়বাড়ন্ত বিস্তার। প্রচুর লাউ হয়। লাউফুলের মধুর জন্য আসে মধুপায়ী নানান প্রজাতির পাখি, মৌমাছি। ঘেরের পাড়ের মাটিতে সুড়ঙ্গ বানিয়ে বসবাস করে ধেনো ইঁদুরের দল। পাশেই আছে বিশাল একটি আমবাগান। সেই বাগানে আছে ফলখেকো অসংখ্য লম্বালেজি গেছো-ইঁদুর। বিষধর-অবিষধর সাপের উপদ্রবও তাই আছে। আছে মাছখেকো-সাপখেকো হলুদ গুইসাপের আনাগোনা।


লাউয়ের মাচানটা তৈরি করা হয়েছে দড়ির জাল বিছিয়ে। লিকলিকে নির্বিষ গেছোসাপরা ওই সুবিস্তৃত মাচানজুড়ে ওত পেতে থাকে ছোট ছোট পাখি ও পোকামাকড় গেলার আশায়।

২২ মে, ২০২১। সকালে ঘের মালিক হুমায়ূন কবীর ঘেরপাড়ে আসতেই মাছখেকো ভূতুম প্যাঁচাটি ডানা ঝাপটে দড়ির মাচান থেকে পালাতে চায়। রাতের কোনো এক প্রহরে মূলত মাছখেকো পাখিটি ইঁদুর অথবা মাছের আশায় ডাইভ দিয়ে আটকে পড়ে মাচানের দড়িতে, মুক্তি পাওয়ার জন্য পাখিটা চেষ্টা কম কিছু করেনি- মুক্তি না পেয়ে ভয় ও ক্লান্তি-শ্রান্তিতে হাঁপিয়ে একেবারে নেতিয়ে পড়ে ছিল মাচানে। মানুষ দেখে এখন আবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

হুমায়ূন কবীর অনেক কষ্টে বড়সড় পাখিটিকে জালের ‘ফাঁদ’ থেকে মুক্ত করলেন। খবর দিলেন স্থানীয় ‘ওয়াইল্ড লাইফ মিশন’-এর সেক্রেটারি রাশেদ বিশ্বাসকে। ঘটনাস্থলে এসে রাশেদ ফোন করলেন আমাকে। সবকিছু জেনেশুনে তাকে যথার্থ পরামর্শ দিলাম।

তিনি ও হুমায়ূন কবীর পাখিটিকে দিনভর খাঁচায় বন্দি রেখে সন্ধ্যার পরে আমবাগানের একটি গাছের ডালে বসিয়ে দিয়ে পর্যবেক্ষণে রইলেন। মাত্র ২১ মিনিট পরে পাখিটি উড়াল দিয়ে দূরে চলে গেল। ওই মুহূর্তে রাশেদ ও হুমায়ূন কবীর ফোনে আনন্দ সংবাদটা জানালেন। রাশেদ ‘বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ ক্লাব’-এর একজন সক্রিয় সদস্যও।

আনন্দ সংবাদ এজন্য বললাম যে, ভূতুম প্যাঁচারা প্রায় দু’যুগ ধরে একটা ‘ম্যাগনেট’ বিপদে আছে। এমনিতেই বাংলাদেশের গ্রামীণ বনের বড় বড় গাছ আজ আর নেই বলতে গেলে- নেই বাসা বাঁধার জুৎসই জায়গা। তারপরে এই প্যাঁচাদের গুরুগম্ভীর ভয়ংকর ডাককে এখনও বাংলাদেশের বহু অঞ্চলের মানুষ অমঙ্গলের প্রতীক বলে মনে করে- আজ থেকে ৬০ বছর আগে এই অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারটা এতই প্রবল ছিল যে, ওদের গুলি করে মারা হতো।

প্রকৃতির কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়ে আমিও স্বীকার করছি যে, ষাট-সত্তর-আশির দশকে বাবার বন্দুক দিয়ে আমিও দু-পাঁচটি প্যাঁচাকে উঠোনের নারকেল গাছের পাতা থেকে গুলি করে নামিয়েছি।

অন্ধ বিশ্বাস আর কুসংস্কার গত ৬০ বছরে অনেকটাই কমে গেছে, কিন্তু নতুন বিপদ ওদের খাদ্য সংকট। এদের খাদ্যতালিকায় আছে ইঁদুর, চামচিকা, ছোট পাখি, কাঁকড়া, ব্যাঙ, সাপ ও মাছ। তবে মূল খাদ্য মাছ। তাইতো মেছো ভূতুমেরা (Brown fish owl) আছে খাদ্য আতঙ্কে।

গ্রামবাংলা তথা হাওর-বাঁওড়-পুকুর-দিঘি-জলাশয়-বিল-ঝিল ইত্যাদি আজ সম্পূর্ণ মানুষের দখলে- যেখানেই জল, সেখানেই মাছ চাষ। তাই মাছ শিকারের অপরাধে (?) ওদের নানাভাবে মারা হয়। তো, ওরা খাবে কী? প্রকৃতির সন্তান হিসেবে ওদেরও তো হক আছে নিশ্চিন্তে বসবাস করার, ইচ্ছেমতো খাবার খাওয়ার ও বংশ বিস্তারের। যে ভূতুমটি লাউয়ের মাচানে আটকা পড়েছিল ও রাতে উড়ে যেতে পেরেছিল, সেটি ওর পরম ভাগ্য। ঘটনাটি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বারুইহাটির, ঘটনার তারিখটিতেই ছিল ‘বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস’।

ভূতুম প্যাঁচার যে ‘ম্যাগনেটের’ কথা বলেছি আমি, সেটা হলো ভূতুম প্যাঁচার মাথায় নাকি ‘ম্যাগনেট’ আছে! মূল্য কোটি কোটি টাকা! অতএব গত দুই যুগে ধরা ও মারা পড়েছে। অনেক ভূতুম প্যাঁচা মারা পড়ছে এখনও, গণমাধ্যমে এ বিষয়ক সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে ও হবে। হুজুগে মানুষ ছুটছে অন্ধ বিশ্বাসে প্যাঁচাদের পেছনে। অধিকাংশ মানুষই ভূতুম প্যাঁচাকে আলাদাভাবে চেনে না। তাই ধরা পড়েছে ও পড়ছে লক্ষ্মীপ্যাঁচা-রাজপ্যাঁচাসহ অন্যান্য প্যাঁচাও।

ভূতুম প্যাঁচা উপকারী-নিরীহ পাখি। খাবার তো তাকে খেতেই হবে। যেখানে পাবে, সেখান থেকেই খাবে। খাবার মৌলিক অধিকার কায়েম করতে গিয়ে তাকে কেন মরতে হবে ম্যাগনেটের কারণে? বন্দুকের গুলিতে?

ভূতুম প্যাঁচার দৈর্ঘ্য ৫৬ সেন্টিমিটার। ওজন এক কেজির বেশি। এরা ডিম পাড়ে এক থেকে দুটি। ডিম ফুটে ছানা হয় ৩৩ থেকে ৩৫ দিনে। সারা বাংলাদেশেই আছে আজো। কিন্তু গ্রামবাংলায় প্রবল-প্রকট সমস্যাগুলো মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারবে কতকাল? ম্যাগনেটই কাল হয়েছে ওদের জন্য। জমির সীমানা পিলার, পাকিস্তান ও ব্রিটিশ আমলের কিছু ধাতব মুদ্রা ও তক্ষক নিয়ে যে হুজুগ চলেছিল ও চলছে, সেটা বন্ধ করা অতি জরুরি।

অন্ধ বিশ্বাস ও রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন ও নেশাটা বন্ধ হওয়া দরকার।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
শর্টলিংকঃ